লালন ফকির কি নিছকই মরমি সাধক, নাকি সমাজবদলেরও এক অগ্রগামী পুরুষ? জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ ও শাস্ত্রের অনুশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর গান হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা, মানবমুক্তির দর্শন। লালনের জীবন, সাধনা ও পদাবলির ভেতর দিয়ে সেই দ্রোহী ও মানবতাবাদী লালনকেই নতুন করে আবিষ্কার করেছেন আবুল আহসান চৌধুরী।
‘কি হল রে জান, পলাশির ময়দানে নবাব হারাল পরান’—লোকসমাজের অজ্ঞাত এক কবির শোকাবেগ ও প্রচ্ছন্ন হাহাকার ইতিহাসের চিরচেনা এই পট ভিন্ন আবহে উন্মোচিত করে দেয়। এই পলাশীর যুদ্ধের ১৭ বছর পর বাংলার এক ক্রান্তিকালে জন্মেছিলেন ফকির লালন সাঁই (১৭৭৪-১৮৯০)। কালের গায়ে আঁকা ছিল সেই অস্থির সময়ের সাক্ষ্য ও চিহ্ন। সেই কালিক সংকট আপাত-ওপরতলার বিষয় বটে, কিন্তু সামাজিক অসাম্য, শাস্ত্রবাহকের হুমকি ও জাতপাতের অনুষঙ্গে যে জনপীড়ন, সে তো ছিল তাঁর অভিজ্ঞতারই অন্তর্গত। দীর্ঘ আয়ুর কল্যাণে পরিবর্তমান সমাজের রূপ ও বিবর্তনের সূক্ষ্ম রেখাটি অবলোকন ও বিচারের দুর্লভ গুণটি তাঁর আয়ত্তের অধীন হয়েছিল। কালে এর অমৃত ফল ফলেছিল তাঁর জীবনে, সাধনায়, দর্শনে ও পদাবলিতে। সেই পথ ধরে যুগন্ধর লালন ক্রমে হয়ে ওঠেন বাঙালির শাশ্বত হৃদয়।
যুগ ও কাল তাঁকে তৈরি করেছিল, ঘটনার অভিঘাত তাঁর মানসে জলতরঙ্গের মতো বেজে উঠেছিল। লৌকিক সাধনার ধারা ও সমাজ-অভিজ্ঞতা তাঁর মনে প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে একাধারে তিনি হয়ে ওঠেন মরমি ও দ্রোহী—একই সঙ্গে ধারণ করেন জল ও অগ্নির ধর্ম, কোমল ও কঠোর মানবীয় রূপ। মরমি লোকসাধনার ভুবনে এমন দৃষ্টান্ত আর পাওয়া যাবে না। এখানেই লালনের স্বাতন্ত্র্য, এখানেই তিনি অদ্বিতীয়। আবির্ভাবের ২৫২ বছর পরে লালন আজও কেন প্রাসঙ্গিক, অপরিহার্য ও প্রেরণার উৎস, সেই রহস্যের সূত্র এখানেই নিহিত।
এই যে চেতনায় দ্বিখণ্ডিত লালন, তার রূপ বিচিত্র ও অনন্য। যে সাধনার ভুবনে তিনি প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে দৃশ্যত বাইরের জগতের ঘটনায় আলোড়িত হওয়ার কথা ছিল না। অথচ বাউলকে প্রতিবাদী ও দ্রোহী হতে হয়েছে কালে-কালান্তরে। কারণ, বাউলের জন্মই মূলত প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে, উচ্চবর্ণের মানুষের বিপক্ষে লড়াই করে, বর্ণশাসিত সমাজের অবসান কামনা করে। ক্ষমতাগর্বী বিত্তবানদের বিরুদ্ধে এ ছিল এক গরিব-গণবিদ্রোহ। মরমি সাধনায় নিম্নবর্গের হতদরিদ্র যেসব মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছিলেন সমাজের অবজ্ঞা ও নিগ্রহ থেকে আত্মরক্ষার জন্য, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে তাঁরা ক্ষোভ ও যাতনায় অগ্রাহ্য ও প্রত্যাখ্যানের গরজ বোধ করেছিলেন অন্তরে। বাউল তাই ‘ব্রাত্য’ ও ‘শাস্ত্রহীন’—গুরুর আদেশ-নিষেধই গান হয়ে তাঁদের দিশা দেয়, অমৃতলোকের পথ দেখায় ‘জ্যান্তে-মরাদের’। লালনের জীবন ও সাধনাও চলেছে এই ধারায় শতাব্দ ধরে।
বারবার আঘাত এসেছে বাউল সম্প্রদায় ও তার প্রধান পুরুষ লালনের ওপর। বাউল ধ্বংস ফৎওয়ার কঠোর বিধান থেকে ব্রাত্য লোকায়ত লালন নামের বই, সেখানে পাওয়া গেল অবাঞ্ছিত রূঢ় এই মন্তব্য: লালন নাকি ‘জন্ম–পরিচয়হীন জারজ’! এই দীর্ঘ পরম্পরায় বাউলবিদ্বেষ ও বাউলঘৃণার শক্ত প্রমাণ মেলে। হয়তো এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পেয়েছে অতি সম্প্রতি উগ্র শাস্ত্রবাহকের লালনের মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চাওয়ার স্পর্ধিত শপথে।
লালন সম্পর্কে অবজ্ঞা ও বিদ্বেষ বিকারগ্রস্ত সমাজমনেরই প্রতিক্রিয়ার ফসল। লালনকে এর শিকার হতে হয়েছে এই কারণে যে তিনি সারা জীবন মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন, ঘুণে ধরা সমাজটাকে বদলাতে চেয়েছিলেন, জাত-ধর্মকে দূরে সরিয়ে মানুষকে মানবিক বোধে বিকশিত করার ব্রত নিয়েছিলেন। সামান্য মরমি ফকিরের এসব উল্টো ধারার কর্মকাণ্ড বরদাশত করেননি সমাজের উচ্চবর্ণের মানুষ। কেননা ধর্মের উসিলায়, শাস্ত্রের নামে, অর্থের জোরে, শক্তির দম্ভে সমাজ-ঘরের সব জানালা তাঁরা বন্ধ করে চিরস্থায়ী এক আঁধারের রাজ্য তৈরি করতে চেয়েছিলেন। লালন তাতে বাদ সেধেছিলেন বলেই তাঁকে নানাভাবে আক্রান্ত হতে হয়। ফলে পাষণ্ড, ব্রাত্য, ন্যাড়া, জারজ—এসব গালমন্দ তাঁর প্রাপ্য না হয়ে পারে না। তবে আরোপিত কলঙ্ক আর নিন্দা সমকালেই—উত্তরকালে তো বটেই—বিবেকবান মানুষের সুবিবেচনার কল্যাণে লালনের গৌরবচিহ্ন হয়ে উঠেছিল।

মধ্যযুগে ভারতের সন্ত-সাধকেরাও তুচ্ছ করেছেন জাত-ধর্মকে। কী কবীর, কী রামদাস, কী পল্টু, রজ্জব, তুলসীদাস, কী দাদু—সবার মুখেই ওই একই কথা। লালন কী করে পেয়েছিলেন ‘পিঁড়েয় বসে পেঁড়োর খবর’? নাকি সব মরমির মন ও ভাব একই ছাঁচে ঢালা! এখানে স্থান-কাল সব হারিয়ে যায়, এক অদৃশ্য সুতায় বাঁধা থাকে শুধু মানবপ্রেমী সাধকের মরমি মন। চেতনা ও বিশ্বাসে লালন ছিলেন এঁদেরই উত্তরসূরি।
লালনের তো নিছক নিমগ্ন থাকার কথা গূঢ়-গুহ্য সাধনা আর দেহতত্ত্বের গান রচনায়। কিন্তু অভিজ্ঞতা আর পর্যবেক্ষণে তিনি জেনেছিলেন সমাজের আঁধার না ঘুচলে সাধনার আলো ফুটবে না। সাধন-ঘরানার বাইরে গিয়ে তাই তাঁকে লিখতে হলো সমাজকে জাগানোর গান, মানুষকে আলোকিত করার গান। সমাজের নানা অনাচার, কুরীতি ও অসংগতি ধরা পড়েছে লালনের চোখে। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি জেনেছিলেন, ‘কলিতে অমানুষের জোর/ভাল মানুষ বানায় তারা চোর।’ নীতি-নৈতিকতা হয়ে ওঠে কথার কথা, ‘তলে তলে তলগোঁজা খায়/লোকের কাছে সতী কওলায়/এমন সৎ অনেক পাওয়া যায়/সদর যে হয় সেই পাতকী।’
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার জন্য লালন বাচনিক রূপকের সব আড়াল তুলে দিয়ে সরাসরি বলেছেন: ‘অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই/শুনি মানবের উত্তম কিছুই নাই/দেব-দেবতাগণ করে আরাধন/জন্ম নিতে মানবে।’ পুনর্জন্মে বিশ্বাস ছিল না লালনের; তাই একবারের জন্য নশ্বর এই পৃথিবীতে আসার সুযোগকে সুকৃতিতে সার্থক করে তোলার পক্ষে তাঁর ছিল একান্ত আকুতি, ‘কত ভাগ্যের ফলে না জানি/মন রে পেয়েছ এই মানবতরণি/বেয়ে যাও ত্বরায় সুধারায়/যেন ভারা না ডোবে।’
‘জগৎ সত্য ব্রহ্ম মিথ্যা’—এ চেতনা যে অনেকখানিই লালনকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তাঁর গানে সেই পরিচয় প্রচ্ছন্ন থাকেনি। ইহজাগতিকতার হাতছানিতে লালন সাড়া না দিয়ে পারেননি, ‘এমন মানব-জনম আর কি হবে/মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে।’ পরলোকে স্বর্গপ্রাপ্তির চেয়ে দুনিয়ার ‘নগদ পাওনা’র প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি—তাঁর কোনো কোনো গানে সেই কথাটিও জানাতে তিনি ভোলেননি।
মানুষই ছিল লালনের মনোভূমির কেন্দ্রে। তাই মানবজীবন, মানবগুরু, মানবভজনার কথা বারবার উঠে এসেছে তাঁর গানে। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’, ‘ভবে মানবগুরু নিষ্ঠা যার/সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার’, ‘আছে যার মনের মানুষ মনে তোলা সে কি জপে মালা’, ‘মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে/সে কি অন্য তত্ত্ব মানে’— লালনের এসব পদ সাধনার প্রয়োজনে বাঁধা হলেও তা মূলত মানববন্দনারই গান।
লালন জাত-ধর্ম-শাস্ত্র কিছুই মানেননি। গোত্র-বর্ণের বালাই ছিল না তাঁর। নারী ও পুরুষ—এই হলো মানুষের জাত-পরিচয়। এই সাধক নিজের চোখেই তো দেখেছেন, জাত-ধর্ম আর হিন্দু-মুসলমান ভেদ-বিভেদের ফল কী ভয়াবহ। তাই তাঁকে জাত-ধর্মের সুতা কেটে যৌবনের প্রথম প্রহরেই ঘর ছাড়তে হয়েছিল। তারপর তিনি খুঁজে পান তাঁর ‘জীবনেরও জীবন সাঁই’ গুরুকে, দীক্ষা নেন সিরাজ সাঁইয়ের কাছে, দাখিল হন ফকিরি মতে। এখন ধর্ম আর জাতের দাবি রইল না। কিন্তু তাঁর না থাকলেও, তাঁর কাছে-কোলের মানুষ যারা তারা তো মানুষের পরিচয় খুঁজে ফেরে জাত-ধর্মের মধ্যেই— মানুষটি হিন্দু না মুসলমান? তারা লালনকে জেরবার করে তোলে তাঁর জাত-পরিচয় জানার জন্য। লালন এড়িয়েও পার পান না, জবাব দিতেই হয়, ‘সব লোকে কয় লালন ফকির হিন্দু কি যবন/লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান।’ এরপর অতৃপ্ত জাত-সন্ধানীদের জানাতে হয় জাতপাতের অসারতার কথা, তিনি যুক্তি দিয়ে বোঝান, ‘বিবিদের নাই মুসলমানী/পৈতা নাই যার সেও তো বাওনী/বোঝ রে ভাই দিব্যজ্ঞানী/লালন তেমনি জাত একখান।’
মধ্যযুগে ভারতের সন্ত-সাধকেরাও তুচ্ছ করেছেন জাত-ধর্মকে। কী কবীর, কী রামদাস, কী পল্টু, রজ্জব, তুলসীদাস, কী দাদু—সবার মুখেই ওই একই কথা। লালন কী করে পেয়েছিলেন ‘পিঁড়েয় বসে পেঁড়োর খবর’? নাকি সব মরমির মন ও ভাব একই ছাঁচে ঢালা! এখানে স্থান-কাল সব হারিয়ে যায়, এক অদৃশ্য সুতায় বাঁধা থাকে শুধু মানবপ্রেমী সাধকের মরমি মন। চেতনা ও বিশ্বাসে লালন ছিলেন এঁদেরই উত্তরসূরি। সমাজ ছিল শ্রেণি-বর্ণ-গোত্রে বিভক্ত জাতপাতের কঠিন নিগড়ে বাঁধা। লালন তাঁর দ্রোহের আগুনে এসব অসাম্য-বিভাজনকে পুড়িয়ে ছাই করতে চেয়েছেন: ‘লালন কয় জাত হাতে পেলে/পুড়াতাম আগুন দিয়ে’। সন্ত কবীর থেকে সাধক লালন এই বোধ-বিশ্বাসেই হয়ে ওঠেন কালান্তরের স্বজন।
লালন জাত মানেননি, শাস্ত্র মানেননি, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে তাঁর আস্থা ছিল না, কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয়েও মতি ছিল না। নির্বিচার অন্ধবিশ্বাস খারিজ করে তিনি সেখানে যুক্তিকে বসিয়েছেন। তাই সহজেই বলতে পারেন, ‘বেদে কি তার মর্ম জানে’ কিংবা ‘বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার/উদয় হয় না দিনমণি’!
লালনের মনে ভাব এলে হামেশাই তাঁর গানের ‘পুনা মাছের ঝাঁক’ আসত। লালন মূলত গানের মানুষ। যে মরমি সাধনায় তিনি নিমগ্ন ছিলেন, গানের জমিনেই তার ফুল ফুটেছে। গানই ছিল তাঁর জীবনবেদ, সাধনার পদ্ধতি-ব্যাখ্যা আর আত্মপ্রকাশের বাহন। হিতকরী পত্রিকার মন্তব্যও তা–ই, লালনের গানেই তাঁর ‘নাম, ধর্ম, মত ও বিশ্বাস সুপ্রচারিত’ হবে (৩১ অক্টোবর ১৮৯০)। ভাবমগ্ন সাধক একতারায় আলতো আঙুল বুলিয়ে সুর তুলতেন গলায়। জন্ম নিত নানা রঙের নতুন নতুন ভাবের গান। তখন গানে মগ্ন সৌম্য-শান্ত এক মরমি সাধকের অনন্য ছবি আঁকা হয়ে যেত শিষ্য-শাবকদের চোখে। সেই সাধকই একদিন বিচলিত হয়ে উঠলেন—মনের মধ্যে ঝড় উঠল। তাঁর প্রাণের দোসর কুমারখালীর কাঙাল হরিনাথকে বাঁচাতে হবে জমিদারের লাঠিয়ালের হাত থেকে। কাঙাল তাঁর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় জমিদারের প্রজা-পীড়নের খবর ছেপে জমিদারের রোষে পড়েন। একতারার বদলে হাতে উঠল বাঁশের লাঠি। ছেঁউড়িয়া থেকে শিষ্য-শাবক নিয়ে লালন ছুটলেন কুমারখালীতে। হাঁকিয়ে দিলেন জমিদারের পাইক-বরকন্দাজকে। প্রাণরক্ষা হলো প্রজাদরদি হরিনাথের। সাধক-বাউল বুঝিয়ে দিলেন অন্যায়–অত্যাচারের প্রতিবাদ করা, সত্য-ন্যায়ের পথে থাকা, মানুষের সম্ভ্রম-সম্মান রক্ষা করাই মানুষের ধর্ম। এ-ও ‘মানুষ সত্য’ সাধনারই অঙ্গ।
বাউলেরা যে সমাজবিচ্ছিন্ন নন, নির্জন সাধনাতেই যে শুধু তাঁদের জীবন কাটে না—এর প্রমাণ লালন তো হাতে-কলমে দিয়ে গেছেন। তাঁর কণ্ঠ বেজে উঠেছে প্রতিবাদে-বেদনায়, ‘রাজ্যেশ্বর রাজা যিনি/চোরেরও শিরোমণি/নালিশ জানাব কার কাছে!’ এ কি শুধুই রূপক, বাস্তবতাবর্জিত তত্ত্বকথা? ভিন্ন যুগে কি এই বচন অপ্রাসঙ্গিক?
লালনের জীবনে নারীর অস্তিত্বও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। নারীর জীবন কেমন ছিল তাঁর কালে? আজ থেকে দুই শ বছর আগে নারীকে কী চোখে দেখেছিলেন লালন? এসব কৌতূহল-জাগানো প্রশ্নের জবাবে এক নতুন লালনকে খুঁজে পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে বাঙালি নারী প্রথম মুক্তি পেয়েছে সাহিত্যে। প্রেমে-প্রতিবাদে-ব্যক্তিত্বে-আকাঙ্ক্ষায় প্রথম নারীকে আবিষ্কার করা যায় সাহিত্যে, যার সূচনা মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলিতে। লোকসাহিত্যেও নারীর আলাদা অস্তিত্বের স্বাক্ষর মেলে। কিছুটা পরোক্ষে বা রূপকের মধ্য দিয়ে হলেও বাংলার লোকজ মরমি সাধনা ও সাহিত্যেও বিশেষ করে বাউলের সাধনা ও গানে নারী তার আপন মহিমা নিয়ে উপস্থিত। বাউলসাধনায় নারীর একটি ভিন্ন গুরুত্ব ও মূল্য আছে। নারী বা প্রকৃতি বাউলের সাধনসঙ্গিনী— সমান মর্যাদার অধিকারী। নারীর মহিমা, শ্রেষ্ঠত্ব ও দৃঢ়তার প্রকাশ মেলে লালনের এই গানে, ‘মায়েরে ভজিলে হয় সে বাপের ঠিকানা/নিগূঢ় বিচারে সত্য গেল তাই জানা।’ এই বাণী পুরুষতন্ত্রের প্রাধান্য চূর্ণ করেছে। নারীর প্রতি লালনের যে শ্রদ্ধা, মনোযোগ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি তা তাঁর সম্প্রদায়ের দর্শন থেকেই এসেছে।
লালন জাত মানেননি, শাস্ত্র মানেননি, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে তাঁর আস্থা ছিল না, কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয়েও মতি ছিল না। নির্বিচার অন্ধবিশ্বাস খারিজ করে তিনি সেখানে যুক্তিকে বসিয়েছেন। তাই সহজেই বলতে পারেন, ‘বেদে কি তার মর্ম জানে’ কিংবা ‘বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার/উদয় হয় না দিনমণি’! ‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়’—লালনের এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে? প্রাতিষ্ঠানিক সব ধর্ম সম্পর্কেই তিনি ছিলেন উদাসীন ও সংশয়ী। কোনো শাস্ত্রেই তাঁর আস্থা ছিল না। তাই তিনি বলেন, ‘এক এক দেশে এক এক বাণী/পাঠান কি সাঁই গুণমণি/এসব মানুষের রচনা জানি/লালন ফকির কয়।’ তিনি এই বক্তব্য পেশ করেছিলেন এক অজ্ঞ-অজ্ঞান-ধর্মান্ধ সমাজে বাস করে! লালন যদি আজ এমন কথা উচ্চারণ করতেন, তাহলে তাঁর অবস্থা হয়তো মনসুর হাল্লাজের মতোই হতো।
তাঁর উপলব্ধিজাত প্রজ্ঞা, সাধনার ধারা ও সঙ্গ-সান্নিধ্যের সৌজন্যে সাধন-বিভূতি ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক সামাজিক শক্তির প্রতীক, যার অনিবার্য ফল অজস্র ও অনবদ্য পদাবলি। সমাজমনস্ক লালন গ্রহণ করেছিলেন লোকশিক্ষকের ভূমিকা এবং হয়ে উঠেছিলেন গ্রামীণ নবজাগরণের এক অসাধারণ মহানায়ক।
মুসলমান ‘জল’ খায় না, হিন্দু ‘পানি’ পান করে না। কিন্তু লালন অনিচ্ছুক হিন্দু-মুসলমানকে এক ঘাটের ‘পানি’ ও ‘জল’ খাইয়ে ছেড়েছেন তাঁর গানে সমার্থক এ দুটি শব্দই সমান মর্যাদায় সাদরে গ্রহণ করে। জাতধর্মের প্রশ্রয়ে লালিত ভাষা-সাম্প্রদায়িকতার মূলও এভাবে কেটে দিয়েছেন তিনি। এরপরেও কি কেউ বলবেন সাধকজীবনে আসার পর লালন বিশুদ্ধ হিন্দু কিংবা নিষ্ঠ মুসলমান ছিলেন? তাঁর ভাষ্যে এই বার্তাই পৌঁছে যায়, তিনি না ছিলেন হিন্দু, না ছিলেন মুসলমান, তার বদলে প্রাণপণে ‘মানুষ’ হতে চেয়েছেন।
পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক এসব বিষয়কেও লালন মোটেই আমলে নেননি। পাপ-পুণ্যের ধারণাকে তিনি ‘দেশাচার’ বলে গণ্য করেছেন, ‘পাপ-পুণ্যের কথা আমি কারে বা শুধাই/এই দেশে যা পাপ গণ্য অন্য দেশে পুণ্য তাই।’ মুসলমানদের ‘ভেস্ত’ বা হিন্দুর ‘স্বর্গ’—লালন কোথাও যেতে চাননি, এ দুই-ই তাঁর কাছে ‘ফাটক সমান’ মনে হয়েছে—এই হাজতখানার বাসিন্দে হতে ‘কার বা তা ভালো লাগে’!
লালন ছিলেন কালের অগ্রগামী পুরুষ। কিন্তু কাল তাঁর বিরুদ্ধে ছিল। সমাজ-মন তৈরি ছিল না তাঁর কথা শোনা কিংবা তার তৎপর্য বোঝার জন্য। তাই তাঁকে অনেক আঘাত সইতে হয়েছে। তাঁর মনে কখনো বেদনা, কখনো হতাশা জেগেছে। তাই তিনি হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে গান রচনা করেছেন: ‘এ দেশেতে এই সুখ হলো আবার কোথা যাই না জানি/পেয়েছি এক ভাঙা নৌকা জনম গেল সেচতে পানি।’
কিন্তু মানবগুরু লালন তো পরাভব মানতে পারেন না। হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ তো তাঁর ধর্ম হতে পারে না। যাঁর তরঙ্গমুখর নদী হওয়ার বাসনা ছিল, দুকূল ভাসানো স্রোতস্বিনী হওয়ার কথা ছিল, তিনি কিনা হয়ে রইলেন ‘আন্ধেলা পুকুরে’র সামান্য ‘কূপজল’! কিন্তু লালন তো মানুষকে দিশা দিতে চান, তাই সুসময়ের জন্য আশা জাগিয়ে রাখেন: ‘কবে হবে সজল বরষা, রেখেছি মন সেই ভরসা।’ একদিন বর্ষা নামবে, নব-জলধারায় সিক্ত হবে এই রুক্ষ মাটি, সবুজে ভরে যাবে ফসলের মাঠ—সত্য হয়ে উঠবে লালনের স্বপ্ন।
উনিশ শতকে বাঙালি ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছিল। সেই ঘুম-ভাঙানিয়া নকিব ছিলেন রামমোহন। কিন্তু তাঁর ডাক তো শুনেছিলেন শুধু কলকাতার মানুষ আর তার প্রতিধ্বনি জেগেছিল বাংলার দু–চারটি বড় শহরে। কিন্তু আঁধারে ঢাকা পড়ে রইল বৃহত্তর বঙ্গদেশের গ্রামের পর গ্রাম। সেই গ্রামদেশে মাটির প্রদীপ জ্বালালেন লালন ফকির। প্রতিক্রিয়ার দমকা হাওয়ায় বারবার সেই আলো নিভে যেতে চায়, লালন বুক দিয়ে আগলে রেখে সেই আলোর শিখার বলয় প্রসারিত করলেন বিশাল বাংলায়। রামমোহন নিজে লেখাপড়া জানতেন, তাঁর অনুসারীরাও, তাই তাঁর কীর্তি-কর্মের কথা পাঁচ মুখে প্রচার পেল। কিন্তু উচ্চবর্গের ভদ্রজনের উপেক্ষা-অবহেলায় লালন চাপা পড়লেন। কে তাঁর কথা বলবে? পেশাদার ইতিহাসবিদেরা এ বিষয়ে নীরব হয়ে রইলেন বাংলার সামাজিক ইতিহাস লিখতে গিয়ে। শুধু একবার অন্নদাশঙ্কর রায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘বাংলার নবজাগরণে রামমোহনের যে গুরুত্ব, বাংলার লোকমানসের দেয়ালী উৎসবে লালনেরও সেই গুরুত্ব।’
ইতিহাস সৃষ্টির অর্থ যদি হয় ‘সমকালীন সমাজে নিজেকে বিকশিত করা’, তবে তা লালন সক্ষমতার সঙ্গে সার্থকভাবেই করতে পেরেছিলেন। তাঁর প্রভাববলয় শুধু গ্রামীণ শিষ্য-শাবক-ভক্ত-অনুরাগীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফ হোসেন, ঠাকুরবাড়ির জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ, ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক ও সদস্য এবং তাঁর স্বকালের অনেক কীর্তিমান পুরুষ পর্যন্ত প্রসারিত হয়। তাঁর উপলব্ধিজাত প্রজ্ঞা, সাধনার ধারা ও সঙ্গ-সান্নিধ্যের সৌজন্যে সাধন-বিভূতি ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক সামাজিক শক্তির প্রতীক, যার অনিবার্য ফল অজস্র ও অনবদ্য পদাবলি। সমাজমনস্ক লালন গ্রহণ করেছিলেন লোকশিক্ষকের ভূমিকা এবং হয়ে উঠেছিলেন গ্রামীণ নবজাগরণের এক অসাধারণ মহানায়ক।
আবুল আহসান চৌধুরী: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ
