রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের মাছ, পানি ও তলদেশের মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। বিভিন্ন গবেষণায় মাছের নমুনা বিশ্লেষণে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ও তন্তুর সন্ধান পাওয়ার পাশাপাশি পানি ও মাটিতেও এসব দূষকের উপস্থিতি মিলেছে। এতে হ্রদের জলজ পরিবেশ, দেশীয় মাছের প্রজনন এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, আতঙ্কিত না হয়ে প্লাস্টিক দূষণের উৎস বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণায় কাপ্তাই হ্রদের মাছ ও পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। এসব গবেষণায় রুই, কাতলা, কালিবাউশ, তেলাপিয়া, কাচকি, চাপিলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। নমুনা বিশ্লেষণে মাছের পরিপাকতন্ত্রে প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র তন্তু, নাইলনের কণা এবং প্লাস্টিকজাত বর্জ্যের ভাঙা অংশ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্ল্যাটফর্ম স্প্রিংগার নেচার লিংক ও সায়েন্সডাইরেক্টে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
বিজ্ঞাপন
গবেষণার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কাপ্তাই হ্রদের রিজার্ভ বাজার, শুভলং বাজার ও বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ঘাট এলাকা থেকে মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পাঁচ প্রজাতির দেশি ছোট মাছের ৭৫টি নমুনার সব কটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

নমুনায় ট্যাংরা মাছে সর্বাধিক মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ ০.৬৩ গ্রাম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। মাছ ধরার সরঞ্জাম ও গৃহস্থালির প্লাস্টিক বর্জ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ফাইবার বা তন্তু ৮৫ শতাংশ এবং পলিথিনজাত পলিমার ৭১ শতাংশ নমুনায় পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় জানানো হয়। তবে এসব ফলাফল নির্দিষ্ট নমুনা ও গবেষণার পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পুরো হ্রদের সব মাছের ক্ষেত্রে একই মাত্রার দূষণ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই বলছেন গবেষকরা।
বিজ্ঞাপন
গবেষকদের মতে, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম, গৃহস্থালির প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পলিথিন ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হতে পারে। মাছের প্রজাতি, আকার ও খাদ্য গ্রহণের ধরন অনুযায়ী এসব কণা গ্রহণের মাত্রায় পার্থক্য দেখা দিতে পারে। মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি জলজ প্রাণীর স্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করলেও এর মাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের সঙ্গে কাজ করা মৎস্য গবেষক মঈনউদ্দীন পাঠান বলেন, সম্প্রতি কাপ্তাই হ্রদের পানি ও মাটি নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। সেখানেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ-সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈফুদ্দিন রানা বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদের মাছের মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। মূলত এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোই গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কাপ্তাই হ্রদের মাছ খাওয়া যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্লাস্টিকদূষণ বন্ধ করা এবং দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে আনা।’
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, ‘হ্রদে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য দীর্ঘসময় পরিবেশে থেকে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। এসব কণা পরিবেশের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দূষণের উৎস বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
রাঙ্গামাটি মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম বলেন, কাপ্তাই হ্রদের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার কথা তিনি শুনেছেন। তারাও এ বিষয়ে গবেষণার পরিকল্পনা করছেন।
বিজ্ঞাপন

হ্রদে প্লাস্টিক ও পলিথিনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।
মাছের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পরিপাকতন্ত্র, কিডনি ও যকৃতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে জানান রাঙ্গামাটির সিভিল সার্জন নুয়েন খীসা। তবে এসব অঙ্গের ক্ষতির সঙ্গে কাপ্তাই হ্রদের মাছের মাইক্রোপ্লাস্টিকের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও বৈজ্ঞানিক তথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
কাপ্তাই হ্রদের দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক উদ্যোগের কথা জানিয়ে রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, ‘হ্রদকে দূষণমুক্ত রাখতে প্রশাসন কাজ করছে। দোকানি ও ব্যবসায়ীদের বর্জ্য রাখার জন্য ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। হ্রদকে দূষণমুক্ত রাখতে শিগগির কাপ্তাই হ্রদে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
বিজ্ঞাপন
১৯৬২ সালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্মিত কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ রাঙ্গামাটি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলাধার। মৎস্য সম্পদ, স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পর্যটনের জন্যও হ্রদটির গুরুত্ব রয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটকদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য হ্রদের দূষণ বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় পরিবেশবাদী ব্যক্তিদের অভিযোগ, রাঙ্গামাটি পৌর এলাকার বর্জ্যের একটি অংশ সরাসরি হ্রদের পানিতে গিয়ে পড়ছে। পর্যটন মৌসুমে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যও দূষণের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, পানির স্রোত ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। পরে এসব কণা পানির পাশাপাশি তলদেশের মাটি ও জলজ প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, কাপ্তাই হ্রদের প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার, হ্রদে সরাসরি বর্জ্য ফেলা বন্ধ, পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে মাছ, পানি ও তলদেশের মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণে ধারাবাহিক গবেষণা প্রয়োজন।
আবু দারদা খান আরমান/এসআর/জেআইএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
