ফুলকুমারীর কথা আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। গ্রামে ওকে ফুলু নামে ডাকা হতো। সে ছিল আমাদের স্কুলের সহপাঠী। ক্লাস সিক্স থেকে এইট পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছিলাম। তার গায়ের রং কালো হলেও আমরা সহপাঠীরা প্রায় সবাই মনে মনে ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। ওকে আমরা নাম দিয়েছিলাম ‘কালো মেম’। ক্লাস এইটের কথা। আমার গ্রামের ছেলেমেয়েরা সবাই প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে একসঙ্গে হেঁটে স্কুলে যেতাম। রাস্তার দুপাশে আখের খেত হওয়ায় একা যেতে ভয় হতো। বিশেষ করে গ্রামের মেয়েরা তো ওই রাস্তা দিয়ে একা যেতে প্রচণ্ড ভয় পেত। তাই কোনো মেয়ে পারতপক্ষে একা নির্জন বুনো রাস্তা দিয়ে যেত না।
সেদিন সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। মন চাইছিল না স্কুলে যেতে। তবুও মার বকুনি খেয়ে ছাতা নিয়ে প্রস্তুত হয়েছি স্কুলে যাব। হঠাৎ উত্তর দিক থেকে প্রচুর চিৎকার আর চেঁচামেচি শোনা গেল। বড়দের সঙ্গে আমিও দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি আমাদের স্কুলের রাস্তায় গোটা পঞ্চাশেক যুবক ও বয়স্ক পুরুষ। কয়েকজন নারীও আছেন। আখের খেতের এই মাথা থেকে ওই মাথায় কাউকে খোঁজা হচ্ছে। বড়রা কাউকে বকা দিচ্ছে। একজনকে বলতে শুনলাম, জানোয়াররা, মানুষ না।
আরেকজন বলছে, দেশের মা-বোনদের নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। আমার এক কাকা, যার চারজন স্কুলপড়ুয়া মেয়ে। একটা ছেলে সন্তানের অনেক আশা করেছিলেন। কিন্তু তার আশা পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, এখন তো আমার মেয়েদের চিন্তায় আর ঘুম হবে না।
আমার চোখ একজনের দিকে গিয়ে আটকে গেল। আরে ফুলু। আমাদের কালো মেম সাহেব! সে কাঁদছে কেন? তার স্কুলের ইউনিফরমে কাঁদা কেন? কেউ একজন তাকে স্নেহের সুরে বলছে, কাঁদিস না মা। আবার কেউ বলছে, একা একা পথে বের হওয়ার দরকার কী?
এরপর ফুলু হলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সহপাঠী রতন বলল, চল আমরা ফুলুদের বাড়ির পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব! তাহলে বিচারে কী হয় তা শোনা যাবে। কিন্তু চতুর্থ দিন আবার বিচার বসার কথা থাকলেও তার আর প্রয়োজন হয়নি। ফুলুকে বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে না। ওর মা ওকে নিয়ে চলে গেছে। ওর নিরীহ বাবা কিছুই বলতে পারছে না।
কেউ কেউ সহজ-সরল যোসেফ গমেজকে বলছে, কেমন কর্তা হয়েছ মেয়ে আর বউ কোথায় তা বলতে পার না? মাতবররা খুশি, কারণ তাদের আর বিচারে বসতে হয়নি। যে জানোয়ারটা ফুলুকে জোর করে আখের খেতে নিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে চেয়েছিল সে হলো এই এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বখাটে ছেলে। নেতার কথাতেই গ্রাম্য মাতবররা ওঠে-বসে। তারা রফা করার চেষ্টা করছে।
আমরা চার বন্ধু আমাদের ‘কালো মেম’ নিখোঁজ হওয়ায় খুব আঘাত পেলাম। রতন কোনোদিন বিড়ি-সিগারেট খায়নি। সে বিড়ি কিনে বিড়িতে টান দিয়ে উদাসভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি শুতে গিয়ে কত যে বালিশ ভিজিয়েছি, তা বলতে পারব না।
আমরা আরও বেশি আঘাত পেলাম যখন শুনলাম কালো মেম ঢাকায় চলে গেছে। সে সেখান থেকে কলকাতা তার মামার বাড়ি চলে যাবে। তার মানে তাকে আমরা আর দেখতে পাব না। আর দেশে থেকেইবা কী হবে, সেখানে এতটুকুন একটা মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রামের সব মানুষ জানার পরও উল্টো কিশোরী ফুলুর দিকেই দোষের পাল্লা ভারী হচ্ছে। একজন মাতবরকে বলতে শুনলাম, ফুলুরই ইচ্ছা ছিল। তাই ওকে নেতার ছেলে শুভ কুপ্রস্তাব দিয়েছিল। আমি মনে মনে শুয়োরের বাচ্চা বলে গালি দিয়েছিলাম ওই নেতাকে। ওর আসলে বিবেক বলে কিছু নেই। শুধু নামেই নেতা হয়েছে।
বর্গাচাষি ফুলুর বাবা ছিলেন অশিক্ষিত। গরিব। তাই তাকে নীরবে শুধু কাঁদতে হয়েছে। আমরা সেই ফুলুর কথা, আমাদের কালো মেমের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। এসএসসি, এইচএসসি পাস করে সব বন্ধু বিভিন্ন শহরে চলে যাই পড়াশোনার জন্য। যে কালো মেমকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত, সেই রতন এইচএসসির পর ধর্মীয় সংঘে প্রবেশ করে ব্রাদার হয়েছে। কমল যে কথা কম বলত সে আজ উদীয়মান উকিল। আর রবার্ট সাব-ইন্সপেক্টর হয়ে রাজশাহীতে দারোগা হিসেবে জয়েন করেছে।
আমি একটি পত্রিকায় রিপোর্টার।
ব্রাদার রতন বাদে আমাদের সবারই এখন যার যার সংসার আছে। আমরা যার যার মতো নিজেদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। একদিন ব্রাদার রতন ফোন দিয়ে বলল, দোস্ত শুনেছিস, আমাদের ফুলু গ্রামে ফিরে এসেছে। সে এখন চিকিৎসক। আমি অবাক হলাম। সঙ্গে খুশিও।
ফুলকুমারী কলকাতা গিয়ে ডাক্তারি পড়েছে। ইতোমধ্যে তার বিয়ে হয়েছে। একটি মেয়েও আছে। ফুলকুমারী প্রতিজ্ঞা করেছে, যে গ্রাম থেকে সে অপমান হয়ে একদিন তার মায়ের সঙ্গে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, সে গ্রামেই তার বাবার নামে হাসপাতাল দেবে। গ্রামের মানুষের সেবা করবে।
তার প্রতি শ্রদ্ধায় আমাদের সবার বুকটা ভরে ওঠে।
