কানাডার অন্টারিও প্রদেশের অন্যতম বৃহৎ শহর মিসিসাগার সিটি কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাঙালি নারী অনন্যা মজুমদার। পেশায় আইনবিষয়ক পরামর্শক, একসময় কানাডার পার্লামেন্টে নীতিবিষয়ক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। দুই দশকের বেশি সময় ধরে মিসিসাগার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনন্যা এবার শহরটির ২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। আগামী ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য পৌর নির্বাচনে তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন স্থানীয় ভোটাররা। নির্বাচনী প্রচারে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন নিরাপদ আবাসিক এলাকা, স্থানীয় ব্যবসার উন্নয়ন, করের অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং পরিকল্পিত নগরায়ণকে।
অনন্যা মজুমদারের জন্য নির্বাচনী রাজনীতি একেবারে নতুন নয়। ২০১০ সালেও তিনি মিসিসাগার ১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেবার নয়জন প্রার্থীর মধ্যে ষষ্ঠ হয়েছিলেন। পেয়েছিলেন ৪৬১ ভোট। দীর্ঘ ১৬ বছর পর এবার তিনি ভোটের মাঠে ফিরেছেন অন্য একটি ওয়ার্ড থেকে। আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক কর্মকাণ্ড তাঁকে কতটা এগিয়ে দেবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মিসিসাগায় ২২ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন অনন্যা। এই শহরেই তাঁর কর্মজীবন, ব্যবসা ও সামাজিক যোগাযোগের বিস্তার। সাংবাদিকতায় স্নাতক ডিগ্রির পাশাপাশি ফিন্যান্স ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমবিএ করেছেন তিনি। পেশাগতভাবে তিনি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্যারালিগ্যাল এবং নোটারি পাবলিক। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার বিরোধ, ক্ষুদ্র দাবির মামলা এবং ভবন নির্মাণের অনুমতি ও নগর পরিকল্পনাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
অনন্যার কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় কানাডার পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সে কাজ করার অভিজ্ঞতা। তাঁর প্রকাশিত জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, সাবেক ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রী ও মিসিসাগার সংসদ সদস্য আলবিনা গুয়ার্নিয়েরির দপ্তরে নীতিবিষয়ক গবেষণা এবং কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ব্যবসায়ও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন অনন্যা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাইবার নিরাপত্তা ও টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা তিনি। ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকেই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখেছেন বলে দাবি করেন। তাঁর মতে, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না, একটি এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এবারের নির্বাচনে তাঁর অন্যতম অঙ্গীকার স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সিটি কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ বাড়ানো, স্থানীয় পণ্যের প্রচার এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির কথা বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সম্পত্তিকর বৃদ্ধি ঠেকানো এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মিসিসাগার দ্রুত নগরায়ণ নিয়েও তাঁর উদ্বেগ রয়েছে। নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও অনন্যা মনে করেন, উন্নয়ন হতে হবে বিদ্যমান অবকাঠামো, পরিবেশ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজন বিবেচনা করে। বিশেষ করে শহরটির জলাধার, সবুজ এলাকা ও লেক অন্টারিওর তীরবর্তী প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনী অঙ্গীকারের বাইরে সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অনন্যার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁর নির্বাচনী ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীদের সহায়তা, শিশুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং খাদ্যসহায়তামূলক বিভিন্ন উদ্যোগে কাজ করেছেন তিনি। নির্যাতনের শিকার কয়েকজন নারীকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া এবং সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন। নির্বাচিত হলে নারী আশ্রয়কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সহযোগিতা বাড়াতে চান।
প্রবীণদের সেবার বিষয়টিও তাঁর নির্বাচনী প্রচারে স্থান পেয়েছে। প্রকাশিত একটি প্রচারপত্রে তিনি অঙ্গীকার করেছেন, নির্বাচিত হলে পৌর কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও প্রবীণসেবা আরও শক্তিশালী করার পক্ষে কাজ করবেন। এসব সেবা যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে এবং কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
সিটি কাউন্সিলের সঙ্গে নাগরিকদের যোগাযোগ সহজ করতে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। তিনি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে এমন একটি ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের সমস্যা, অভিযোগ ও পরামর্শ সরাসরি তুলে ধরতে পারবেন বলে তাঁর প্রত্যাশা।
তবে নির্বাচনে অনন্যাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে। ২ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর অ্যালভিন টেডজো মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ওয়ার্ডটিতে এবার কোনো বর্তমান কাউন্সিলর পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে নেই। ফলে আসনটি ঘিরে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বিভিন্ন পেশা ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক প্রার্থী কাউন্সিলর হওয়ার চেষ্টা করছেন।
মিসিসাগা দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কানাডার ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, শহরটিতে দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার ৮০০, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অনন্যা যে ২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেখানেও দক্ষিণ এশীয়সহ বিভিন্ন অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এমন একটি বৈচিত্র্যময় নির্বাচনী এলাকায় অনন্যাকে শুধু বাঙালি বা দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর নয়, অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোটারদের আস্থাও অর্জন করতে হবে।
মিসিসাগার নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২২ সালের পৌর নির্বাচনে শহরটির মাত্র ২১ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। এবার ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নিজেদের পক্ষে সমর্থন আদায় করা প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘদিন ধরে মিসিসাগায় বসবাসকারী অনন্যা নিজেকে শুধু একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে চান না। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের প্রধান বক্তব্য, ধর্ম-বর্ণ ও জাতিগত পরিচয়নির্বিশেষে ওয়ার্ডের সব বাসিন্দার স্বার্থ রক্ষা করা। নিরাপদ মহল্লা, শক্তিশালী স্থানীয় অর্থনীতি এবং নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তিনি ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।
এবারের নির্বাচনে তাঁর দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক যোগাযোগ ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কতটা ভোটে পরিণত হবে, তা জানা যাবে ২৬ অক্টোবরের ভোটের ফলাফলে। বাঙালি বংশোদ্ভূত এই নারীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, মিসিসাগার বাসিন্দাদের আস্থা অর্জন করে সিটি কাউন্সিলে জায়গা করে নেওয়া।
এনএন/ ১৮ অক্টোবর ২০২৬
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::কানাডার মিসিসাগায় কাউন্সিলর পদে লড়ছেন বাঙালি নারী অনন্যা মজুমদার first appeared on DesheBideshe.