কওমি ধারার সাতটি ইসলামী রাজনৈতিক দলকে নিয়ে পৃথক ঐক্য গঠনের উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে এগিয়ে চলা এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য ভুলে একসঙ্গে চলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে দলগুলো। ঐক্যের রূপরেখা তৈরির জন্য প্রতিটি দলের তিনজন ও হেফাজতের সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে ২৪ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ২২ অক্টোবর ঐক্যের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। তবে নতুন প্ল্যাটফর্মের রাজনৈতিক কাঠামো, নেতৃত্ব এবং বিদ্যমান জোটের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে।
সম্ভাব্য এ ঐক্যে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। হেফাজতে ইসলাম নিজে রাজনৈতিক দল না হলেও সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে সাত দলকে কাছাকাছি আনার প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতার ভাষ্য, মতপার্থক্য কমিয়ে দলগুলো এখন ঐক্যের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া বিভাজন কমিয়ে আনাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে থাকা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে জোট থেকে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, কয়েকটি কওমি ধারার দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে যায়। আবার জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ যুক্ত হয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে। এই বাস্তবতায় জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের বাইরে সাত দলের নতুন উদ্যোগ ইসলামপন্থি রাজনীতিতে পৃথক সমন্বয়কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
সূত্র জানায়, দুই মাস আগে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরী মাদ্রাসায় সাত দলের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রতিটি দলের পাঁচজন করে মোট ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সেখানে ঐক্যের একটি খসড়া রূপরেখা উপস্থাপন করা হলেও সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বৈঠকে ঐক্যের কাঠামো ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে প্রতিটি দলের কাছে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের লিখিত মতামত ও প্রস্তাব নিয়ে ইতোমধ্যে সমন্বিত রূপরেখার খসড়া তৈরি করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এ নিয়ে শিগগিরই হেফাজতের আমিরের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পরে সাত দলের নেতাদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত করা হবে রূপরেখা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শের ভিত্তিতে জোটটির স্থায়ী রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। চলতি মাসেই এটি চূড়ান্ত করার আভাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ঐক্য গঠনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যমান রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন। প্রস্তাবিত সাত দলের ঐক্যে অন্য কোনো জোট বা ঐক্যের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে কিনা, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। উদ্যোক্তা মহলসহ বেশির ভাগ দল চাইছে, নতুন ঐক্য হলে অন্য কোনো জোটের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার সুযোগ থাকবে না।
একাধিক দলের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে জানান, সাত দল এক হওয়ার পরও কোনো দল বিএনপি বা জামায়াতের মুখাপেক্ষী থাকলে এই ঐক্যের সুফল আসবে না। ঐক্য হতে হলে অন্য সব বলয় থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের মতে, ধর্মীয় ও জাতীয় ইস্যুতে সবাই এক ব্যানারে আন্দোলন করলেও রাজনৈতিক জোট কিংবা নির্বাচনকেন্দ্রিক সমঝোতার বিষয়ে প্রতিটি দলের নিজস্ব এখতিয়ার থাকা উচিত।
এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে, একই প্ল্যাটফর্মে থেকে কোনো দল বিএনপি বা জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুক্ত থাকলে নতুন ঐক্য কার্যকর হবে না। দলটির অবস্থান, ঐক্যে থাকা দলগুলোর অন্য রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দলের মত ভিন্ন। তাদের মতে, ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করার জন্য ঐক্য গঠন করা যেতে পারে। তবে রাজনৈতিক জোটে থাকা কিংবা নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা প্রতিটি দলের নিজস্ব এখতিয়ারে থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সাত দলের ঐক্য গঠনের জন্য বিদ্যমান রাজনৈতিক জোট ছাড়ার বিষয়ে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তার মতে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে থেকেও সাত দলের যৌথ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে, তা দলীয় আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। ফলে ঐক্যের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও সেটিকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জোটে রূপ দেওয়ার প্রশ্নে এখনও সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে।
হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী আমাদের সময়কে বলেন, এখন পর্যন্ত কওমি ধারার সাতটি দল ঐক্য গঠনে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে। আশা করি, ২২ অক্টোবর চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে।
নতুন ঐক্যের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী আমাদের সময়কে বলেন, সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্বে থাকবেন না মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তিনি দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দেবেন; রাজনৈতিক দলের নেতারাই নেতৃত্ব দেবেন। তার ভাষ্য, প্রতিটি দলের নিজস্ব মতামত রয়েছে। সবাই কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও ঐক্যের চেষ্টা করছেন। নেতৃত্বের বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বলেন, কওমি অঙ্গনের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতেই তারা বিএনপি, জামায়াত কিংবা আওয়ামী লীগ- কারও বলয়ে না গিয়ে সাত দলের এই মোর্চা গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন।
জামায়াতকে এই ঐক্যে না রাখার কারণ হিসেবে আজিজুল হক ইসলামাবাদী দাবি করেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদাগত মতাদর্শের সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব রয়েছে। তার মতে, এটি মূলত ধর্মীয় ইস্যু, কোনো রাজনৈতিক বিরোধ নয়।
এ নিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম আমাদের সময়কে বলেন, হেফাজতের নেতৃত্বে দলগুলোর পৃথক প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে ঐক্য দাঁড়াবে কিনা তা সময়েই বলে দেবে। এর পর আনুষ্ঠাকি প্রতিক্রিয়া জানাবে জামায়াত।
