সাভারের হেমায়েতপুরের জাদুরচরের বাসিন্দা আরাফাত হোসেন শায়ানের বাসা। এই শায়ান আবার এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্রসহ অন্তত ১০ মামলা রয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে শায়ানের বাসায় ঢুকেই তাকে মারধর শুরু করে ভুয়া ডিবির পুলিশ সদস্যরা।
সাভারের হেমায়েতপুরের জাদুরচরে আরাফাত হোসেন শায়ানের বাসায় ঢুকেই তাকে মারধরের অভিযোগ ওঠেছে ভুয়া গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যদের বিরুদ্ধে। এদিকে শায়ানের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্রসহ অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
শায়ানের অভিযোগ, তাকে ভয় দেখানো হয়, তাকে জেলে নেয়া হবে। বাঁচতে চাইলে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে। একপর্যায়ে শায়ানকে বাসা থেকে বের করে নেয়া হয়।
এ বিষয়ে শায়ান জানান, ‘এখান দিয়ে আসল, এসে এই রুমে ঢুকছে। তখন খালাকে যখন আসতে বলি। আমার মনের মধ্যে একটু সাহস ছিল যে, রাস্তার মধ্যে বের হলে তো চাইলে একটা অস্ত্র দিয়ে ফাঁসাতে পারবেন, অন্য যেকোনো জিনিস দিয়ে হয়তোবা—আমার নামে যদি কোনো এলিগেশন থাকে, ওইটা দিয়ে কিছু করতে পারবেন, কিন্তু অস্ত্র দিয়ে ফাঁসাতে পারবেন না।’
শুধু বিকাশে নয়, নগদে আরও দেড় লাখ টাকা ওই চক্রকে দিতে হয় শায়ানকে। তখন নগদ টাকা ছিল না তার কাছে। টাকার জন্য ফোন দেন তার খালাকে।
শায়ানের খালা স্টার নিউজকে জানান, ‘কিন্তু ওরে এমন প্রেসারে রাখছে, কোনো কথাই বলতে পারছিল না। পরে ওই যে সিএনজি ফিলিং স্টেশনটা আছে, ওখানে টাকাগুলা আমি ওর কাছে দেই। ওর কাছ থেকে ওই রেড-মেরুন কালারের গেঞ্জি পরা লোকটা টাকাগুলা নিয়ে আবার ওই মোটরসাইকেলে থাকা লোকটার হাতে দিলো।’
বিকাশের যে নম্বরে টাকা দেয়া হয় এবং সিসি ফুটেজে থাকা চেহারা শনাক্ত করে চক্রটিকে খুঁজতে শুরু করে স্টার নিউজ। তথ্য অনুযায়ী, চক্রে রয়েছেন একজন কথিত সাংবাদিক। নাম নিবির চৌধুরী। যিনি আবার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ও পুলিশের সোর্স বলেও পরিচয় দেন। খুঁজতে খুঁজতে নিবির চৌধুরীকে পাওয়াও যায় রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায়।
এখন প্রশ্ন হলো, ৩০ সেপ্টেম্বর সাভারের হেমায়েতপুরে নিবির কেন গিয়েছিলেন? এ বিষয়ে ভুয়া ডিবি চক্রের সদস্য নিবির চৌধুরী বলেন, ‘এই দেখো, আমার সেই অস্ত্রের ব্যাগটা। তোমাকে দেখাব, ওই যে অস্ত্রের ব্যাগটা, সেটা দেখা যাবে।‘
সাভারের হেমায়েতপুরে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভুয়া ডিবির চক্রটি এসেছিল মোটরসাইকেলে করে। এর মধ্যে একটি মোটরসাইকেলের নম্বর সংগ্রহ করি আমরা। সেটির রেজিস্ট্রেশনের ঠিকানা ধরে ঢাকার কল্যাণপুরে মোটরসাইকেলটি খুঁজে পাই আমরা। মালিকের নাম বাবুল।
গাড়ির মালিক বাবুল জানান,‘আমাদের সিনিয়র পারসন, বড় ভাই, গাড়ি চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘গাড়িটা দাও তো ভাই।’ পরে আমি গাড়িটি দিয়ে দিই। এরপর সেখান থেকে গাড়িটি নিচে রাখা হয়।’
সিসি ফুটেজ দেখে শনাক্ত হওয়া এই ব্যক্তিই সেই আরিফ। ভুয়া ডিবি সেজে মাদক মামলার আসামি শায়ানের বাসায় যাওয়া চক্রের নেতা তিনি। অভিযুক্ত আরিফুর রহমান মিরপুর থানার ১১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা। রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে আরিফের অংশ নেয়ার কিছু ছবি ও ভিডিও আসে স্টার নিউজের কাছে। সিসি ফুটেজে শনাক্ত হওয়ার পরেও ভুয়া ডিবি চক্রে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন আরিফ।
এদিকে অভিযুক্ত আরিফুর রহমান স্টার নিউজকে বলেন,‘ওই বস্তির মধ্যে বসে আছেন, আর বস্তিতে মাদক নিয়ে কারবার চলে মাদকের টাকা খায়। আওয়ামী লীগের লোকজনও সেখানে বসে আছেন। তারা হত্যা মামলার আসামি। এদিকে ধরেন না। ভাই, আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নই। আপনি ‘বুংবাং’টা বুঝতে পারেননি? আমার বহুত সাংবাদিক আছে।’
ভুয়া ডিবি চক্রের এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর সাভার মডেল থানায় অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তবে তা আমলে নেয়নি পুলিশ। পরপর দুই কর্মকর্তাকে তদন্তের কাজ দেয়া হলেও কেউ ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত করেনি। সবশেষ, অভিযোগটির তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় এসআই আলমগীর হোসেনকে।
তবে তদন্তের দায়িত্বে থাকা এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ভাই, অভিযোগ তো অনেকই আছে। অভিযোগ তো আর একটিমাত্র নয়। ব্যস্ততার কারণে সময় দিতে পারিনি। আমি তো দুই-তিন দিন আগে সেখানে গিয়েছিলাম। কিশোরগঞ্জে দুই দিন ছিলাম।’
তদন্ত কেন হয়নি? কেন ভুয়া ডিবি চক্র শনাক্ত হলো না, এ নিয়ে সাভার থানায় স্টার নিউজ টিম। থানার ওসিকে বিষয়টি জানানো হলে, আমাদের সামনেই ফোন দেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলমগীরকে।
এ প্রসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেনকে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল আলম বলেন, ‘এক মাস আগের অভিযোগটি আমাকে জানাননি কেন? এক মাস আগে যে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, আর আমি জানলাম না। আপনি যখনই অভিযোগটি পেয়েছেন, তখনই সেটি পড়ে দেখবেন যে অভিযোগের গুরুত্ব কতটুকু। অভিযোগের গুরুত্ব যাচাই করে আমাকে জানাবেন।
তিনি বলেন, অভিযোগটি তো এক মাস ধরে অন্য একজনের কাছে ছিল। তিনি ইতিমধ্যে বদলি হয়ে গেছেন। তাহলে এখন আমার করণীয় কী? বিষয়টি আমাকে এখনই দ্রুত জানান।’
আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যামেরায় কথা না বললেও সাভার থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, শিগগিরই এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।
