কালবেলা · স্বাস্থ্য
ঢাকা মেডিকেলে রাতের আঁধারে দালালদের কারবার
২৫/১০/২০২৬

রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। অভিযোগ উঠেছে, দিনের বেলায় সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলেও রাতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে গিয়ে ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে রোগীদের।
এই সুযোগে হাসপাতালের ভেতরেই সক্রিয় হয়ে উঠছেন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কিছু কর্মী। চিকিৎসকদের পাশে অবস্থান করে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মী রোগীদের বোঝান, তাদের মাধ্যমে পরীক্ষা করালে কোনো ঝামেলা হবে না। এমনকি নমুনা সংগ্রহের আড়াই ঘণ্টার মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে পিডিএফ রিপোর্ট এবং তিন ঘণ্টার মধ্যে মূল রিপোর্ট হাতে দেওয়ার আশ্বাসও দেন তারা।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধানে নামে কালবেলা। ঘাড়ের ব্যথা নিয়ে রোগী সেজে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান কালবেলার প্রতিবেদক। চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েকটি পরীক্ষা করানোর কথা উঠতেই পাশে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নিজেদের মাধ্যমে পরীক্ষা করানোর জন্য চাপ দিতে থাকেন।
একপর্যায়ে তাদের মাধ্যমে পরীক্ষা করাতে রাজি হন কালবেলার প্রতিবেদক। এরপর হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসকের পাশেই ওই প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী প্রতিবেদকের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। নমুনা দেওয়ার আড়াই ঘণ্টা পর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয় পিডিএফ রিপোর্ট। তিন ঘণ্টা পর হাতে দেওয়া হয় মূল রিপোর্ট। পরে সেই রিপোর্ট চিকিৎসককে দেখালে তিনি রোগীকে নাপা ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিউক্লিয়াস ডায়াগনস্টিকসহ একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয়ে কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। তারা রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষা শেষে রোগীর স্বজনদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠিয়ে দেন রিপোর্ট।
ফরিদপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আসমা বেগম (৪০) বলেন, ‘টাকার অভাবে গ্রামে চিকিৎসা না করিয়ে শেষ সম্বলটুকু নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসেছিলাম। ভাবছিলাম সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাব। কিন্তু রাত হতেই কিছু মানুষ এসে বলল, হাসপাতালের মেশিনে পরীক্ষা ভালো হবে না, রিপোর্ট পেতে দেরি হবে। ভয় দেখিয়ে আমাদের রক্তের স্যাম্পল নিয়ে গেল বাইরের ল্যাবে। যে পরীক্ষার খরচ সরকারিভাবে অল্প টাকায় হতো, সেটার জন্য আমাদের থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা হাতিয়ে নিল। আমাদের মতো গরিব মানুষের পেটে তারা লাথি দিচ্ছে।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান বরিশাল থেকে আসা আলিম উদ্দিন (৫৫)। তিনি বলেন, ‘রাতের বেলা হাসপাতালের লোক বলে পরিচয় দিয়ে কয়েকজন এল। আমরা সহজ-সরল মানুষ, কিছু বুঝি নাই। চিকিৎসার প্রয়োজনে তারা বাইরের ল্যাবে টেস্ট করাতে বলল। না বুঝে টেস্ট করাতে দিয়ে বুঝলাম আমরা দালালের খপ্পরে পড়েছি।’
এ বিষয়ে নিউক্লিয়াস ডায়াগনস্টিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে রোগী নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তারা কিছুই জানে না। বিষয়টি নিজস্বভাবে অনুসন্ধান করে দেখার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। দালালচক্র কিংবা এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗