বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। ইউরোপজুড়ে তখন শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক দর্শনের তোড়জোড়, আর প্রাচ্যে চলছে শত শত বছরের আধ্যাত্মিক চর্চা ও জ্ঞানানুসন্ধানের পুনর্জাগরণ। পৃথিবীর দুই বিপরীত প্রান্তের দুই প্রদীপ্ত মানব, প্রাচ্যের কবি ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং প্রতীচ্যের যুক্তিবিদ ও গণিতজ্ঞ বার্ট্রান্ড রাসেল।
বাহ্যিকভাবে একজন সুর ও কাব্যের সাধক, অন্যজন গণিত ও যুক্তির বিশ্লেষক। কিন্তু গভীরে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, দুজনের মূল অন্বেষণ ছিল একই। মানুষের মুক্তি, সত্যের উপলব্ধি এবং অহং বা ক্ষুদ্র সত্তার সীমা পেরিয়ে অনন্তের স্পর্শ লাভ।
১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথের ইংল্যান্ড সফরকালে এই দুই চিন্তাবিদের প্রথম প্রত্যক্ষ পরিচয় হয়। তারপর থেকে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে বৌদ্ধিক বোঝাপড়ার সেতু। ১৯১২ সালের ১৩ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ রাসেলকে একটি চিঠি লেখেন, যা প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে দলিল হয়ে রয়েছে।
মঙ্গলবার নোবেল ফাউন্ডেশন তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোবেলজয়ী এই দুই মনীষীর বিরল চিঠিটি প্রকাশ করে। কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির বার্ট্রান্ড রাসেল আর্কাইভে সংরক্ষিত এই শতবর্ষী চিঠিটি আজ শুধু এক টুকরো কাগজ নয়, বরং অমূল্য সম্পদ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) কেবল কবি বা গীতিকার ছিলেন না; ছিলেন মানবতাবাদী দার্শনিক। ১৯১৩ সালে তিনি এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। বৈদিক দর্শন, উপনিষদ এবং আবহমান বাংলার বাউল ও লোকভাবনার সার নির্যাসকে তিনি সর্বেশ্বরবাদী দর্শনে রূপ দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে ধর্ম কোনো নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান বা অন্ধবিশ্বাস ছিল না; ধর্ম ছিল মানুষের ভেতরের ‘অনন্ত সত্তা’ বা ‘সীমার মাঝে অসীমের’ জাগরণ।
অন্যদিকে, বার্ট্রান্ড রাসেল (১৮৭২–১৯৭০) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ব্রিটিশ দার্শনিক, গণিতবিদ, যুক্তিবিদ এবং সমাজসংস্কারক। আধুনিক বিশ্লেষণাত্মক দর্শনের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তিনি। সারাজীবন অন্যায়, যুদ্ধ এবং অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন এই জ্ঞানসাধক। যদিও রাসেল ছিলেন যুক্তিবাদী ও নাস্তিক্যভাবাপন্ন, তবুও মানুষের আত্মিক মুক্তি ও অহংমুক্ত জীবনের প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেছিলেন। সাহিত্যে ও মুক্তচিন্তায় অনন্য অবদানের জন্য ১৯৫০ সালে তাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে রবীন্দ্র-দর্শন যদি হয় হৃদয়ের অনুভূতির প্রসারণ, তবে রাসেল-দর্শন ছিল যুক্তির স্বচ্ছ আলোকপাত। অথচ ১৯১২ সালের এই একটি চিঠি প্রমাণ করে, জ্ঞান ও সত্যের চূড়ায় পৌঁছে এই দুই জ্ঞানতাপস কীভাবে একই বিন্দুতে মিলিত হয়েছিলেন।
১৯১২ সালের জুনে রবীন্দ্রনাথ যখন ইংল্যান্ডে পৌঁছান, তখন তার রচিত ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদ সুধীমহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই সফরের সময়েই রাসেলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়। পরবর্তীতে রাসেল ‘হিবার্ট জার্নাল’ (Hibbert Journal)-এ ‘দ্য এসেন্স অব রিলিজিয়ন’ (The Essence of Religion) বা ‘ ধর্মের মূলকথা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।
প্রবন্ধটিতে রাসেল আলোচনা করেছিলেন কীভাবে মানুষ তার ক্ষুদ্র ‘স্বার্থপর সত্তা’ (finite self) অতিক্রম করে এক ‘উদার বা অনসীম সত্তা’র (infinite self) অভিজ্ঞতা পেতে পারে। রাসেল বলতে চেয়েছিলেন, সত্যিকারের ধর্ম বা আত্মিক চেতনা মানুষকে ভয় থেকে মুক্তি দেয় এবং এক মহাজাগতিক আনন্দের অনুভূতি এনে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ যখন কেমব্রিজে বসে রাসেলের এই নিবন্ধটি পড়েন, তখন তিনি সেখানে উপনিষদের প্রাচীন ঋষিদের সুর শুনতে পান। যে সত্য হাজার বছর আগে ভারতের ঋষিরা সংস্কৃত শ্লোকে উচ্চারণ করেছিলেন, আধুনিক ইউরোপের একজন যুক্তিবাদী দার্শনিকের কলমেও যেন ঠিক সেই একই সত্য অন্য রূপ পেয়েছে। এই অনুভূতির কথা জানিয়েই রবীন্দ্রনাথ রাসেলের উদ্দেশ্যে চিঠিটি লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মূল ইংরেজি চিঠির ভাবানুবাদ নিচে উপস্থাপন করা হলো—
প্রিয় মি. রাসেল,
আপনার সুন্দর চিঠির জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি ডক্টর শীলকে বলব আপনার সঙ্গে কেমব্রিজে গিয়ে দেখা করতে, এতে করে আপনিও তাকে আরও কাছ থেকে জানার ও বোঝার সুযোগ পাবেন।
‘হিবার্ট জার্নাল’-এর শেষ সংখ্যায় ‘দ্য এসেন্স অব রিলিজিয়ন’ (ধর্মের সারকথা) বিষয়ক আপনার লেখা নিবন্ধটি আমি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পড়েছি। এটি আমাকে উপনিষদের একটি শ্লোকের কথা মনে করিয়ে দিল, যা ঠিক এই রকম— “যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ। আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান ন বিভেতি কুতশ্চন।” এর ভাবার্থ হল: “যার কাছে পৌঁছাতে না পেরে বাক্য ও মন ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে, সেই ব্রহ্মের বা অনন্তের আনন্দকে যিনি জেনেছেন, তিনি আর কোনো কিছুই ভয় পান না।”
শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান বা প্রজ্ঞার সাহায্যে তাকে ধরা যায় না; কিন্তু আপনি যখন সেই অনন্তের জীবন যাপন করেন এবং নিজের ক্ষুদ্র বা সীমিত সত্তার সীমানায় আবদ্ধ থাকেন না, তখন আপনি সেই পরম আনন্দের উপলব্ধি লাভ করেন, যা আমাদের দৈনন্দিন স্বার্থপর জীবনের সব সুখ-দুঃখের অনেক ঊর্ধ্বে। আর তখনই আপনি সব ধরনের ভয় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হন।
এই পরম আনন্দই হলো ব্রহ্মের প্রত্যক্ষ ও ধনাত্মক উপলব্ধি। এটি এমন কোনো ধর্মীয় মতবাদ বা বিশ্বাস নয় যা কোনো কর্তৃপক্ষ জোর করে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়; বরং এটি হলো অনন্তের পরম সত্য উপলব্ধি, যা আমরা লাভ করতে পারি কেবল আমাদের সংকীর্ণ অহংবোধের বাঁধন ভেঙে এবং আমাদের ইচ্ছা ও ভালোবাসাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দিয়ে।
আপনার বিশ্বস্ত,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চিঠিতে উল্লিখিত ‘ডক্টর শীল’ ছিলেন ভারতীয় পণ্ডিত, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, যিনি রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং সেসময় কেমব্রিজ সফরে ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও রাসেলের এই চিঠিটি ছিল প্রাচ্যের বৈদিক প্রজ্ঞা এবং আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের সম্মিলন। উপনিষদের যে শ্লোকটি রবীন্দ্রনাথ উদ্ধৃত করেছিলেন, তা মানুষের ভয়হীনতার কথা বলে। মানুষ যখন নিজেকে কেবল শরীর বা একটি ক্ষুদ্র স্বার্থপর সত্তা হিসেবে দেখে, তখনই তার মনে হারানোর ভয়, মৃত্যুর ভয় এবং দুঃখের যন্ত্রণা দানা বাঁধে। কিন্তু যখন সে বুঝতে পারে সে এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের অংশ, অনন্তের সঙ্গে সে একসূত্রে গাঁথা, তখনই তার ভেতর থেকে সব ভয় মুছে যায়।
বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো দার্শনিকও তার প্রবন্ধে স্বীকার করেছিলেন যে, মানুষের অহংবোধ যখন শিথিল হয়ে সর্বজনীন ভালোবাসায় রূপ নেয়, তখনই জীবনের পরম সার্থকতা আসে। রবীন্দ্রনাথ রাসেলের সেই যুক্তির ভেতরেই দেখতে পেয়েছিলেন উপনিষদের ‘অনন্ত আনন্দের’ বাণী।
চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে, ঈশ্বর বা পরম সত্য কোনো প্রথাগত ধর্মে আবদ্ধ বিষয় নয়। এটি কোনো শাস্ত্র বা পুরোহিতের চাপিয়ে দেওয়া শাসনও নয়। এটি সম্পূর্ণ নিজের ভেতরের এক অনুভূতির বিস্তার। সংকীর্ণ স্বার্থপরতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে যখন ভালোবাসা ও ইচ্ছাশক্তিকে জগতের কল্যাণে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তখনই মানুষ ব্রহ্মের বা অসীম আনন্দের স্বাদ পায়।
চিঠিটি লেখার ঠিক এক বছরের মাথায়, ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পান। আর তার ৩৭ বছর পর, ১৯৫০ সালে রাসেলও পান সাহিত্যের এই সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। দুটি ভিন্ন পথে হেঁটে দুজন মানুষ সম্মানিত হয়েছিলেন, কিন্তু ১৯১২ সালের সেই এক মিষ্টি শরতে তাদের কলমে রূপ পেয়েছিল একই সর্বজনীন মানবসত্য—যে সত্য ভয়কে জয় করে, যা মানুষকে শেখায় ভালোবাসার ডানায় ভর করে সীমাকে পেরিয়ে অসীমে বিলীন হওয়ার মন্ত্র।
