তিন দশকের পুরনো এক অমীমাংসিত হত্যা মামলার প্রধান আসামিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করেছে মার্কিন পুলিশ। বহু বছর আগের এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে প্রথাগত তদন্তের পাশাপাশি ডিএনএ প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তা নিয়েছেন তদন্তকারীরা।
১৯৯৩ সালের ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় ইলিনয়ের গ্রানাইট সিটিতে একটি পিকআপ ট্রাকে উঠতে দেখা গিয়েছিল ৩৪ বছর বয়সি র্যান্ডি গেইল স্পেরিনোকে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর পাশের একটি মাঠ থেকে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার হয়। আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে সে সময় নিশ্চিত হন তদন্তকারীরা।
বিবিসি লিখেছে, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ওই হত্যাকাণ্ডের মূল অপরাধী নাগালের বাইরেই ছিলেন। অপরাধস্থলে পাওয়া ডিএনএ নমুনা উদ্ধার করে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচলিত ডেটাবেইসে মিলিয়েও কোনো ইতিবাচক ফল মেলেনি।
ম্যাডিসন কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের গোয়েন্দারা শত শত মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। বিভিন্ন সূত্র ধরে বছরের পর বছর তদন্ত চালিয়েও তারা হত্যারহস্যের কিনারা করতে পারেননি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আড়াই লাখেরও বেশি অমীমাংসিত হত্যা মামলার তালিকায় হারিয়ে যেতে বসেছিল স্পেরিনো হত্যাকাণ্ডের তদন্ত।
গত বছর এই জট খুলতে নতুন কৌশল নেন গোয়েন্দারা। জিনগত প্রমাণ পাঠানো হয় টেক্সাসের হিউস্টনভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি ‘অথরাম’-এর কাছে। পুরনো ও জটিল অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটনে আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করে কোম্পানিটি।
২০১৮ সালে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা ‘গোল্ডেন স্টেট কিলার’ নামে পরিচিত জোসেফ জেমস ডিয়্যাঞ্জেলোকে শনাক্ত করতে যে ‘ইনভেস্টিগেটিভ জেনেটিক জিনিয়ালজি’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, তা থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়েছেন ম্যাডিসন কাউন্টির গোয়েন্দারা।
ওই ঘটনায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক বংশানুক্রমিক তথ্যভান্ডারে মানুষের জমা দেওয়া ডিএনএ তথ্য ব্যবহার করে একটি পারিবারিক বংশতালিকার রূপরেখা তৈরি করা হয়। সেই সূত্র ধরে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল মূল অপরাধীকে।
প্রচলিত ফরেনসিক পরীক্ষায় সাধারণত সন্দেহভাজন ব্যক্তির ডিএনএর সঙ্গে অপরাধস্থল থেকে পাওয়া ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়।
অন্যদিকে, জেনেটিক জিনিয়ালজি প্রযুক্তির সাহায্যে অপরাধীর দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের ডিএনএ থেকেও তার বংশগত যোগসূত্র খুঁজে বের করা সম্ভব। এর মাধ্যমে অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার পথ তৈরি হয়।
স্পেরিনো হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অথরাম। অপরাধীর সরাসরি ডিএনএ প্রোফাইল না থাকলেও দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের জমা দেওয়া ডিএনএ বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বংশগত যোগসূত্র বের করে কোম্পানিটি। সেই সূত্র ধরে নির্দিষ্ট একজনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন তদন্তকারীরা।
ম্যাডিসন কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের ক্যাপ্টেন টিম লরেন্স বলেন, “এই সূত্রটিই এক মুহূর্তে পুরো মামলার গতিপথ বদলে দিয়েছিল।”
এই সূত্র ধরে তদন্তকারীরা পরে ৭০ বছর বয়সি আলবার্ট ‘বাডি’ জিগলারকে গ্রেপ্তার করেছেন। পুলিশ বলছে, তিনি অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন। চলতি বছরের মে মাসে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের শিকার গেইলের ছেলে ওয়েস স্পেরিনো এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “অবশেষে আমি সান্ত্বনা পেলাম। দীর্ঘ সময় পর জানতে পারলাম, কে এই নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছিলেন।”
যে প্রযুক্তির সাহায্যে জিগলারকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে তা পুরো বিশ্বজুড়ে অমীমাংসিত ফরেনসিক মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
বহু পুরনো অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন ও পরিচয়হীন মরদেহ শনাক্তকরণে এই প্রযুক্তি সাফল্য দেখাচ্ছে।
‘অথরাম’-এর দাবি, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা হাজার হাজার জটিল মামলার সমাধান করেছে।
কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ডেভিড মিটেলম্যান ইনভেস্টিগেটিভ জেনেটিক জিনিয়ালজি পদ্ধতিকে জিপিএস ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, “ডিএনএ প্রোফাইল হচ্ছে জিপিএস সিগনালের মতো, যা সংকেত দেয় যে ‘আপনি ঠিক এই জায়গায় অবস্থান করছেন’। তবে ‘জায়গাটি’ কোথায় তা বুঝতে হলে আপনার একটি মানচিত্র প্রয়োজন।”
বিজ্ঞানী ও গবেষকরা পাবলিক রেকর্ড, শোকসংবাদ ও আদমশুমারির ডেটা ব্যবহার করে সেই মানচিত্রটি তৈরি করেন, যা দিয়ে বিভিন্ন পরিবারের বংশতালিকার পারস্পরিক সংযোগ তৈরি সম্ভব হয়।
মিটেলম্যান বলেন, প্রযুক্তির সাহায্যে সূত্র পাওয়ার পরও পর্যায়ক্রমে তদন্ত চালাতে হয়। সেই তদন্তমূলক পদক্ষেপ ছাড়া শুধু ডিএনএ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে অপরাধের রহস্য পুরোপুরি উদ্ঘাটন করা সম্ভব নয়।
পুরনো অমীমাংসিত মামলা সমাধানে গোয়েন্দাদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে কেবল ডিএনএ প্রযুক্তি একা কাজ করছে না, এর সঙ্গে রয়েছে এআইও।
স্পেরিনো হত্যাকাণ্ডের মতো জটিল মামলায় বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তিন দশকে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ নথি ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করা। ১৯৯৩ সাল থেকে সংগ্রহ করা এসব তথ্যের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র খুঁজে বের করতে তদন্তকারীরা এআইয়ের সহায়তা নেন।
ফ্লোরিডাভিত্তিক সফটওয়্যার কোম্পানি ‘সেন্ট্রালস্কয়ার’-এর ‘সেন্টারলাইন এআই’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা দুই হাজারের বেশি পৃষ্ঠার নথি বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য প্রাসঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও চিহ্নিত করেছেন।
ঘটনার সময়রেখা পুনর্গঠন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য সুবিন্যস্ত করতেও সহায়তা করে এআই ব্যবস্থা।
ক্যাপ্টেন লরেন্স বলেছেন, “একজন গোয়েন্দার জন্য বসে বসে দুই হাজার পৃষ্ঠা পড়ার চেয়ে এআই ব্যবহার করা সহজ ও কার্যকর। তদন্তকারী দল ইন্টারঅ্যাক্টিভ চ্যাটবটের মতো করে এআইয়ের সঙ্গে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তথ্য খুঁজে বের করেছে।”
জিগলারকে শনাক্ত করার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির সহায়তা নেন তদন্তকারীরা। জিজ্ঞাসাবাদের সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তি সত্য বলছেন কি না, তা যাচাইয়ের জন্যও তারা এআইয়ের সাহায্যে দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
তবে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা তদন্তকারীর দক্ষতার ওপর নির্ভর করে উল্লেখ করে শেরিফ ক্যাপ্টেন বলেছেন, “প্রযুক্তির নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে শেষ পর্যন্ত মানুষকেই সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করে সরাসরি কথা বলতে হয়।”
জিনগত পদ্ধতিরও নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
“এই পদ্ধতি সব মামলার সমাধান করতে পারে না। ঘটনাস্থলে কোনো ডিএনএ না পাওয়া গেলে এই কৌশল ব্যবহারের সুযোগ নেই। প্রচলিত ডেটাবেইসে কোনো মিল কাকতালীয়ভাবে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকার চেয়ে এই কৌশল বেশি কার্যকর, তবে, অপরাধী শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এটি নিশ্চিত সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না।”
অথরামের মতো কোম্পানিগুলো কেবল সেসব বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মের তথ্য ব্যবহার করে, যেখানে গ্রাহকেরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহারের জন্য সম্মতি দিয়েছেন। তারপরও ব্যক্তিগত জিনগত তথ্য ব্যবহারের নৈতিকতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের ফরেনসিক জেনেটিকসের অধ্যাপক ডেনিস স্নাইডারকম্ব কোর্ট বলেন, “এখানে ব্যক্তিগত প্রাইভেসির বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। একজন ব্যক্তি হয়তো নিজের ডিএনএ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু তার আত্মীয়দের সম্মতি নাও থাকতে পারে।”
অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাব।
মিটেলম্যান বলেছেন, “প্রতিটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাই এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চায়। তবে এটা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত সরকারি তহবিল বা বরাদ্দ নেই।”
অনেক সময় বিভিন্ন অনুদান বা ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে মামলার তদন্ত খরচ মেটানো হয়। অথরাম একটি ওয়েবসাইট পরিচালনা করে, যেখানে অনুদানের অপেক্ষায় থাকা মামলার তালিকা থাকে ও মানুষ তা অর্থায়নে সহায়তা করতে পারেন।
