রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথমবারের মতো সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল রবিবার (১১ অক্টোবর) বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুপুর ৩টা ৩৪ মিনিটে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত সব প্যারামিটার চাহিদা অনুযায়ী মাত্রায় আছে।
বিকিরণের মাত্রা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ- বায়েরা। এই কেন্দ্রের চুল্লির মডেল তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর ১২০০ মডেলের, যেখানে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বরের শেষদিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন তারা।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা আইএইএ’র গাইডলাইন অনুযায়ী, রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের স্টেজ ‘বি ওয়ান’ মোটামুটি সফলভাবে শেষ হয়েছে। সবশেষ স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভ পরীক্ষার জটিলতাও কেটে গেছে। এর পরের ধাপ ‘বি টু’। এই ধাপে প্রাথমিক অপারেশনের জন্য পারমাণবিক চুল্লিকে প্রস্তুত করা হয়। এরপরই শুরু হয় ক্রিটিক্যালিটি। এটি এমন একটি পর্যায়, যেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন রিঅ্যাকশন বা পরমাণুর বিভাজন তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে চুল্লিতে ধীরে ধীরে স্থায়ী ও নিরাপদভাবে শক্তি বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। এখানে ধাপে ধাপে সফলভাবে এগিয়ে ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত এলে বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
২০ নভেম্বর থেকে মাসের শেষ নাগাদ উৎপাদন শুরুর আশা রোসাটমের : পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে শুরু হয়েছে পারমাণবিক বিক্রিয়া। গতকাল রবিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে প্রথমবারের মতো এ বিক্রিয়া শুরু হয় বলে জানিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো।
তবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হলেও এখনই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিক্রিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যায়ক্রমিক অনুমোদনের ধাপগুলো শেষ হওয়ার পরই শুরু হবে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রোসাটমের প্রত্যাশা, প্রথম ইউনিটে আগামী ২০ নভেম্বর থেকে নভেম্বরের শেষ নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। তবে এটি নির্ভর করবে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর ফলাফল ও কেন্দ্র চালুর প্রস্তুতির ওপর।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, পারমাণবিক বিক্রিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। এরপর ধাপে ধাপে কেন্দ্রটির বিভিন্ন পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। সব ধাপ সফলভাবে শেষ হলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
মস্কোয় বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গে বৈঠকের পর রোসাটমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলেক্সেই লিখাচেভ সাংবাদিকদের জানান, তাদের প্রত্যাশা, প্রথম ইউনিটে ২০ নভেম্বর থেকে মাসের শেষের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে।
লিখাচেভ বলেন, রূপপুর প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর এই প্রত্যাশা প্রকল্পটি সম্প্রসারণের আগ্রহও তৈরি করেছে। এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সম্প্রসারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের।
উৎপাদনের আগে বাকি যেসব ধাপ : পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। কিন্তু এ পর্যায় অতিক্রম করলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা যায় না। রিঅ্যাক্টরের বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীলতা যাচাই, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং ধাপে ধাপে উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। রূপপুরের প্রথম ইউনিটেও এসব কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করতে হবে। পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার ওপর নির্ভর করছে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সময়সূচি।
ফলে রোসাটমের দেওয়া নভেম্বরের শেষ নাগাদের সময়সীমাকে আপাতত প্রত্যাশিত সময় হিসেবেই দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করার মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটির চালুর প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় গতকাল শুরু হলো প্রথম পারমাণবিক বিক্রিয়া। জ্বালানি লোড থেকে বিক্রিয়া শুরু এবং সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রতিটি ধাপই কেন্দ্রটি চালুর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ।
দুই ইউনিটে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এ কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে দুটি ভিভিইআর-১২০০ মডেলের রিঅ্যাক্টর। প্রতিটি ইউনিটের পরিকল্পিত উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটি থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রকল্পটি চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় বড় সংযোজন হবে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কেন্দ্রটির নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা, উৎপাদন ব্যয় এবং জাতীয় গ্রিডে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। এখন রূপপুর প্রকল্পের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নির্ধারিত নিরাপত্তা ও কারিগরি মান বজায় রেখে চালুর বাকি ধাপগুলো সম্পন্ন করা। রোসাটমের প্রত্যাশা অনুযায়ী নভেম্বরের শেষ নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে তা দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে। তবে সেই সময়সীমা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা স্পষ্ট হবে পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষার অগ্রগতি ও ফলাফলের ওপর।
বিআলো/অর্নব