হুমায়ুন কবির সুমন, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
যে বয়সে বাবার স্নেহের ছায়ায় জীবন গড়তে পড়াশোনায় মনোসংযোগী হওয়ার কথা, সেই বয়সেই আদালত প্রান্তরে ঘুরছে কামরুল ইসলাম অনিক। নিজের ন্যায্য অধিকার পাওয়ার আশায় মাকে সঙ্গে করে উকিল-মহুরীদের দ্বারে দ্বারে বছরের পর বছর ঘুরছেন তিনি। আর অধিকার পেতে আইনী লড়াই করতে হচ্ছে তার জন্মদাতা পিতার বিরুদ্ধে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার তেলকুপি গ্রামের বাসিন্দা কলেজ ছাত্র কামরুল ইসলাম অনিক জন্মের পর থেকেই পিতৃস্নেহ বঞ্চিত। তার বাবা সদর উপজেলার গুপিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশিদ জিন্নাহ ওরফে কার্বন। তিনি পৌর এলাকার রহমতগঞ্জ মহল্লার আব্দুর রউফ মনির ছেলে।
অনিকের জীবনের গল্প সিনেমার মতোই। গর্ভে থাকতেই তাকে দফায় দফায় হত্যার চেষ্টা করেন বাবা। মা হাফিজা খাতুনের দৃঢ়তায় পৃথিবীর আলো দেখলেও আজ অবধি বাবার থেকে সন্তানের স্বীকৃতি পাননি তিনি।
মাতৃগর্ভে অনিক যখন আট মাসের, তখনই বাবা খুরশিদ জিন্নাহ স্থানীয় মাতব্বরদের নিয়ে ঘরোয়া শালিসের মাধ্যমে মা হাফিজাকে তালাক দেয়। আর সেই থেকেই মা-সন্তান কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি তিনি।
অসহায় মা হাফিজা কখনো গার্মেন্টেসে আবার কখনো হাসপাতালে নার্সের কাজ করে অনিককে বড় করে তোলেন। দীর্ঘ ২২ বছরে বাবা খুরশিদ জিন্নাহ কোন খোঁজই নেননি সন্তানের।
“যখন আমি বুঝতে শিখেছি, সবার বাবা স্কুলে এসে সন্তানদের টাকা দিচ্ছে কিন্তু আমার বাবা-বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন অনিক।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, পরে মায়ের কাছে জেনেছি-তাদের মধ্যে সম্পর্ক নাই। ছোটবেলা থেকে মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছি, মামাকেই বাবা ডেকেছি। এখন আমি বড় হয়েছি-বাবার পরিচয়টা লাগে, কোথাও গিয়ে পরিচয় দিতে পারি না।
আমার দাদা-দাদীরাও খোঁজ-খবর নেয়নি। তবে আমার বড় চাচা ছোট থেকেই আমাকে দেখতে আসেন। তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন-আমাকে খুব ভালোবাসেন।
অনিকের মা হাফিজা খাতুন বলেন, কার্বনের বাড়ির কাছে আমার প্রথম বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামী মারা যান। এরপর খুরশিদ জিন্নাহ’র সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিয়ে হয়। আমাদের বিয়ের বিষয়টি তার পরিবার মেনে নেয়নি। এ কারণে আমার বাবার বাড়িতে তার সঙ্গে সংসার শুরু করি। তিনি পঞ্চগড়ে গ্লোব এগ্রো কোম্পানীতে চাকরি করতেন। সেখান থেকে সরাসরি আমার কাছে আসতেন। দু-একদিন থাকার পর নিজের বাড়িতে যেতেন। এভাবে টানা ৬ বছর আমরা সংসার করি। এরই মাঝে হঠাৎ করেই তিনি পঞ্চগড়ে বিয়ে করে ফেলেন। বিষয়টি জেনে আমি তার কর্মস্থলে গিয়ে অভিযোগ জানাই। এরপর খুরশিদ জিন্নাহসহ ওই বিয়ে পড়ানোর সঙ্গে জড়িত অফিসের সহকর্মীদের চাকরিচ্যুত হন।
দ্বিতীয় বিয়ে করার পরও আমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক চলমান ছিল। আমিও তার বিয়েটাকে মেনে নিয়েছিলাম। এরই মাঝে আমি গর্ভবতী হয়ে পড়ি। বিষয়টি খুরশিদ জিন্নাহকে জানালে সেই ভ্রুণ হত্যার জন্য বার বার আমাকে চাপ দেয়। আমি কোনভাবে গর্ভের সন্তানকে হত্যা করতে রাজি হইনি।
গর্ভের বয়স আট মাস হলে খুবই অসুস্থ্য হয়ে পড়ি। এই অবস্থায় স্থানীয় কিছু মাতব্বরদের সঙ্গে নিয়ে ঘরোয়া শালিসের মাধ্যমে আমাকে তালাক দেয় খুরশিদ জিন্নাহ।
২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে কামরুল ইসলাম অনিক পৃথিবীতে আসে। সে ভুমিষ্ট হওয়ার পর থেকে আজ তার ২২ বছর বয়স-এর মধ্যে একটি বারের জন্যও সন্তানকে দেখতে আসেনি বা তার খোঁজখবর নেয়নি।
আমি বিভিন্ন কাজ করে ছেলেকে বড় করে তোলার চেষ্টা করেছি। ছোটবেলা থেকেই বাবার কথা বলতো অনিক। সে বলতো, সবার বাবা আছে-আমার বাবা আসে না কেন। আমি আঁচলে মুখ গুজে অনেক কেঁদেছি।
হাফিজা বলেন, এ যাবত নিজের পরিচয়ে বড় করেছি-এখন ছেলের পিতৃ পরিচয় দরকার। এ জন্য ২০২২ সালে সিরাজগঞ্জ আদালতে কামরুল ইসলাম অনিক বাদি করে তার পক্ষে আমি মামলা দায়ের করেছি।
তিন বছর ধরে মামলা চলছে, কিন্তু দিন গড়াচ্ছে আমরা মা-ছেলে ন্যায় বিচার পাচ্ছি না। ডিএনএ টেস্টের আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু দফায় দফায় তারিখ আসে তারিখ যায়, ডিএনএ টেস্ট করানো হয় না।
হাফিজা ও অনিকের বিষয়ে কথা হয়, তেলকুপি গ্রামের জিয়াউর রহমান, মনিজা খাতুনসহ বেশ কিছু নারী ও পুরুষের সঙ্গে। তারা বলেন, খুরশিদ জিন্নাহ কার্বনের সঙ্গে হাফিজার বিয়ে হয়েছিল। আট মাসের গর্ভবতী অবস্থায় হাফিজাকে তালাক দেয়। তাদের ছেলে অনিকের জন্ম হলেও খোঁজ নেয়নি কার্বন।
অনিকের মামা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি নিজে কাজী ডেকে এনে কার্বনের সঙ্গে হাফিজার বিয়ে দিয়েছিলাম। বিয়ের দিন তার পরিবারকে ডেকে এনেছিলাম। তারা কৌশলে তাকে নিয়ে যায়। তার পরিবার বিয়ে মেনে নেয়নি। ফলে হাফিজাকে বাড়িতে না নিলেও কার্বন আমাদের বাড়িতেই সংসার করতে থাকে।
আমার ভাগনের জন্য কষ্ট হয়, শিশু অবস্থায় সবাই যখন বাবা ডাকে, অনিক তখন তার বাবাকে পায়নি। আমার মেয়েরা আমাকে ডাকে, সেইটা দেখে অনিকও আমাকে বাবা ডাকে। অনেকবার ধমক দিয়ে বলেছি, আমি তোমার মামা। কিন্তু সে এখনো আমাকে বাবা বলেই ডাকে।
এ বিষয়ে গুপিড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশিদ জিন্নাহ কার্বনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মুঠোফোনে তিনি বলেন, যেটা আদালতে গড়িয়েছে-সেই সিদ্ধান্ত আদালতই দেবে। আমার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
