পেন্টাগন থেকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা—অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নজরদারির অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর। গবেষকদের দাবি, ইসরাইলি একটি ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনের আড়ালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি চালিয়েছে এবং স্পাইওয়্যার ছড়াতে সহায়তা করেছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) কানাডার সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থা সিটিজেন ল্যাব এবং নিউইয়র্কভিত্তিক বিজ্ঞাপন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কনফিয়ান্ট পৃথক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসকভার-টেকের সেবার মাধ্যমে ইসরাইলি স্পাইওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্যান্ডিরুসহ দেশটির অন্যান্য নজরদারি সংস্থা গুগল, কমকাস্ট ও রাশিয়ার ইয়ানডেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ ২০২১ সালে ক্যান্ডিরুকে কালো তালিকাভুক্ত করে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদদের লক্ষ্যবস্তু করতে ব্যবহৃত স্পাইওয়্যার সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
সিটিজেন ল্যাবের জ্যেষ্ঠ গবেষক উলফি ক্রিস্টল রয়টার্সকে বলেন, অনলাইন বিজ্ঞাপন যেভাবে বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে, তা একটি কাঠামোগত নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ—সবার জন্যই এই ঝুঁকি প্রযোজ্য।
১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন
সিটিজেন ল্যাবের তথ্যমতে, মোবাইল ফোন ও ইয়ারবাডের মতো সাধারণ পণ্যের বিজ্ঞাপনের আড়ালে ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ওয়েবসাইট এবং ৭৫ হাজার অ্যাপে পৌঁছেছে।
গবেষকদের দাবি, এসব বিজ্ঞাপনযুক্ত ওয়েবসাইট পরিদর্শন বা অ্যাপ ব্যবহার করলেই ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও অনুসরণ করা সম্ভব ছিল। কিছু ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ফোন নম্বর সংগ্রহেরও চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিজ্ঞাপনটি শুধু ওয়েবসাইটে লোড হওয়াই নজরদারির জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
কনফিয়ান্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেরোম ডাঙ্গুর ভাষ্য অনুযায়ী, ডিসকভার-টেক প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে অন্তত এক কোটি বিজ্ঞাপন প্রচার করছিল। বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে কুকি-ম্যাচিং নামের তথ্য বিনিময়প্রক্রিয়া ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞাপনের সরাসরি আওতার বাইরেও মানুষকে অনুসরণ করতে পারত। তাঁর ধারণা, বিশ্বজুড়ে কয়েক কোটি নয়, বরং কয়েক শ কোটি মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়ে থাকতে পারে।
আল-জাজিরার ৪৫টি ডিভাইস আক্রান্ত
সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্যান্ডিরুর শক্তিশালী স্পাইওয়্যার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমচালিত ৪৫টি ডিভাইসে প্রবেশ করেছিল। আল-জাজিরার নেটওয়ার্ক লগ পর্যালোচনা করে গবেষকেরা এ তথ্য নিশ্চিত করতে পেরেছেন বলে দাবি করেছেন।
কনফিয়ান্টের দাবি, পেন্টাগন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ স্পর্শকাতর শত শত নেটওয়ার্কে এসব ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। সিটিজেন ল্যাব জাতিসংঘ, ন্যাটো, ইউরোপীয় কমিশন এবং এক ডজনের বেশি দেশের সরকারি নেটওয়ার্কেও একই ধরনের বিজ্ঞাপন দেখানোর প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
ডাঙ্গু আরও দাবি করেন, ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোতে ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি বিশেষভাবে বেশি ছিল। ফলে একটি দেশের মানুষের ডিজিটাল কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে বাদ পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি
অভিযোগ প্রকাশের পর ডিসকভার-টেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। গুগল জানিয়েছে, নীতিমালা ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘনের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে তাদের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ডিজিটাল বিজ্ঞাপন খাতের সংগঠন আইএবি ইউরোপও নিরীক্ষায় নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে অনুমোদিত সরবরাহকারীদের তালিকা থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। কমকাস্টের বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তি সহযোগী বীজওয়্যাক্স তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ডিসকভার-টেককে সরিয়ে দিয়েছে।
ডিসকভার-টেক ও ক্যান্ডিরুর পক্ষ থেকে রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধের জবাব পাওয়া যায়নি।
এদিকে, বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে পেন্টাগন জানিয়েছিল, বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও তথ্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরপর সামরিক বাহিনীর কয়েকটি শাখা নির্দিষ্ট কিছু ডিভাইসে বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং বন্ধ করে দেয়।
সূত্র: রয়টার্স