একজন নাগরিক বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি নিজ দেশে ফিরে আসতে চান এবং দেশে ফেরার জন্য পাসপোর্টের আবেদন করেছেন। কিন্তু দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশন তাঁর আবেদনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। বারবার যোগাযোগ করেও তিনি কোনো উত্তর পাননি। তিনি বাংলাদেশের জন্মসূত্রে নাগরিক ও সাবেক বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি নিজেই বলেছেন, বিদেশে আমি রিফিউজি হিসেবে আছি, আমি ফ্লোটিং ম্যান, একেবারে ভাসমান।
মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম বেদনাগুলোর একটি হলো—নিজের দেশ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে সেই দেশের বাইরে আবিষ্কার করা। মানুষ যখন বিদেশে অবস্থান করেন, তখন তিনি প্রবাসী হতে পারেন; কিন্তু নিজের দেশে প্রত্যাবর্তনের পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে তাঁর অস্তিত্বে জন্ম নেয় এক গভীর বিচ্ছিন্নতা। তিনি তখন কেবল ভৌগোলিক অর্থে ভাসমান নন, নিজের রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও যেন আশ্রয়হীন।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ‘আমি ফ্লোটিং ম্যান, একেবারে ভাসমান’—এই বক্তব্যের মর্মবেদনা এখানেই। তাঁর জন্মভূমি আছে, তাঁর দেশের পরিচয় আছে, সেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিচারিক পদে দায়িত্ব পালনের ইতিহাস আছে; অথচ নিজ দেশে ফিরে আসার জন্য তাঁকে পাসপোর্টের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
এ এক গভীর অস্তিত্বগত বৈপরীত্য—যে রাষ্ট্র মানুষের নাগরিক পরিচয় ও অধিকার রক্ষার আশ্রয়, সেই রাষ্ট্রেই ফিরে আসার নিশ্চয়তা যদি নাগরিক হারিয়ে ফেলেন, তবে নাগরিকত্বের নৈতিক ভিত্তি কোথায়? নাগরিকত্ব কি কেবল রাষ্ট্রের নথিতে লিপিবদ্ধ পরিচয়, নাকি নিজ রাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অধিকার? নাগরিক যখন নিজের রাষ্ট্রের কাছেই ভাসমান ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন, তখন সংকটটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অস্তিত্বের নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতারও।
এস কে সিনহা কী পরিস্থিতিতে বা কোন প্রেক্ষাপটে বিদেশে গিয়েছিলেন, কী পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়েছিলেন বা কেন তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল—সেসব ভিন্ন প্রসঙ্গ। একজন নাগরিকের নিজ দেশে ফিরে আসার অধিকার কি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতার কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে?
রাষ্ট্র যদি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারে, নাগরিক যদি নিজ দেশে ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য হন, আর রাষ্ট্র যদি তাঁর আবেদন সম্পর্কে নীরব থাকে—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: এটি কি নাগরিকের রাষ্ট্র? নাকি নিজ দেশে ফিরে আসার জন্যও নাগরিককে রাষ্ট্রের অনুগ্রহের অপেক্ষায় থাকতে হবে?
প্রথম আলোর ১৩ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে পাসপোর্টের আবেদন করেছিলেন এস কে সিনহা। টরন্টোতে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে বারবার যোগাযোগ করেও তিনি কোনো উত্তর পাননি বলে জানিয়েছেন। বাংলাদেশে একটি দুর্নীতির মামলায় তাঁর দণ্ডাদেশ রয়েছে; তিনি সেই মামলাকে সাজানো বলে দাবি করেছেন। তাঁর এই দাবি ও মামলার বিচারিক অবস্থান পৃথকভাবে বিবেচ্য। কিন্তু তাঁর পাসপোর্টের আবেদন অনিষ্পন্ন থাকার প্রশ্নটি স্বতন্ত্রভাবে সাংবিধানিক ও আইনগত পর্যালোচনা দাবি করে।
কোনো নাগরিক বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পর সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হলে, অথবা দেশে ফেরার পর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের আশঙ্কা থাকলে কিংবা তিনি দণ্ডিত হয়ে থাকলেও, কেবল এসব কারণে তাঁর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় না।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের চলাফেরার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—“আইনসংগত বিধি-নিষেধ সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, ইহার যেকোনো স্থানে বসবাস ও বসতি স্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।”
এটি শুধু একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের প্রশ্ন।
পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যানের একটি প্রচলিত যুক্তি হলো—কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি বিচার এড়িয়ে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। এই আশঙ্কা কোনো কোনো পরিস্থিতিতে আইনগতভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু একজন ব্যক্তি যখন বিদেশে অবস্থান করছেন এবং নিজ দেশে ফিরে আসার জন্য পাসপোর্ট চাইছেন, তখন একই যুক্তি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে?
বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩-এর ৬(১)(ঙ) অনুচ্ছেদে বিচারাধীন ফৌজদারি কার্যক্রমে হাজিরা এড়ানোর আশঙ্কা এবং আদালতের দেশত্যাগ-নিষেধাজ্ঞার মতো পরিস্থিতিতে পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যানের বিধান রয়েছে।
কিন্তু বিদেশে অবস্থানরত একজন নাগরিকের দেশে ফেরার আবেদন এবং বিচার এড়িয়ে দেশত্যাগের আশঙ্কা—এই দুটি পরিস্থিতিকে এক করে দেখা যায় না।
যে ব্যক্তি বিদেশে পালিয়ে যেতে চান, তাঁকে বাধা দেওয়ার আইনগত যুক্তি এবং যে ব্যক্তি দেশে ফিরে এসে বিচার বা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চান, তাঁকে পাসপোর্ট না দেওয়ার যুক্তি এক নয়।
যদি রাষ্ট্রের উদ্বেগ হয় বিচার নিশ্চিত করা, তাহলে নাগরিকের দেশে প্রত্যাবর্তন সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে কীভাবে সাংঘর্ষিক—তার ব্যাখ্যা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
পাসপোর্ট একটি রাষ্ট্রীয় ভ্রমণ-দলিল। কিন্তু এটি ইস্যু করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে রয়েছে বলে রাষ্ট্র ইচ্ছামতো নাগরিকের অধিকার সীমিত করতে পারে না।
আবেদন গ্রহণ করে তার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে নাগরিককে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা যায় কি না, সেটি আরেকটি প্রশ্ন। প্রথমটির উত্তর আইন নির্ধারণ করে; দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ন্যায্যতা, যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আসে।
আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: বিচার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র যে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে, তা কি নাগরিককে তাঁর নিজের দেশে ফিরে আসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে?
যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে মামলা থাকে, তবে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। তাঁর বিরুদ্ধে আইনসম্মত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে কিংবা অন্য কোনো বিচারিক আদেশ কার্যকর থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। পাসপোর্ট ইস্যু করা মানেই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া নয়; দেশে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা মানেই দণ্ডাদেশ বাতিল করা নয়।
দেশে ফেরার অধিকার এবং পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকারকে আইনগতভাবে এক করে দেখা ঠিক নয়। পাসপোর্ট একটি ভ্রমণ-দলিল; দেশে প্রবেশের অধিকার একটি পৃথক সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্ন। তবু পাসপোর্ট না দেওয়ার ফলে কোনো নাগরিকের দেশে ফেরার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রের উচিত নয় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যেখানে একজন নাগরিকের দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা প্রশাসনিক নীরবতার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে।
এখানে নাগরিকের পরিচয়ও কোনো নির্ধারক বিষয় হতে পারে না। তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতি, সাবেক মন্ত্রী, রাজনৈতিক কর্মী কিংবা সাধারণ নাগরিক—যে-ই হোন, আইনসম্মত প্রক্রিয়ার অধিকার সবার সমান।
বিষয়টি বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আনা যেতে পারে।
এস কে সিনহার আবেদনও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাঁর আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তাঁর বিরুদ্ধে পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যানের কোনো নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে আসা উচিত।
একজন নাগরিকের আবেদন দুই বছরের বেশি সময় ধরে অনিষ্পন্ন থাকলে তাঁর প্রতিকারের পথ বন্ধ হয়ে যায় না। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত সিদ্ধান্ত চাইতে পারেন, আইনগত নোটিশ দিতে পারেন এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে রিট আবেদন করতে পারেন। উপযুক্ত আইনগত ভিত্তি ও পরিস্থিতি থাকলে আদালতও বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আমলে নিতে পারেন।
এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশিত:
১. এস কে সিনহার পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে কি না এবং বর্তমানে তা কোন পর্যায়ে রয়েছে?
২. আবেদনটি দুই বছরের বেশি সময় ধরে অনিষ্পন্ন থাকার কারণ কী?
৩. তাঁর বিরুদ্ধে পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যানের কোনো নির্দিষ্ট আইনগত সিদ্ধান্ত বা আদালতের আদেশ রয়েছে কি?
৪. যদি কোনো আইনগত বাধা থাকে, তবে তার প্রকৃতি কী এবং তা দেশে ফেরার আবেদনের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য?
৫. যদি আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকে, তাহলে যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে না কেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাওয়া কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি নয়। এটি প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবি।
একটি রাষ্ট্রের বৈধতা শুধু আইন প্রণয়ন বা আইন প্রয়োগের ক্ষমতা থেকে আসে না; সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার মধ্যেও রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা প্রকাশিত হয়।
আইনের শাসনের অর্থ শুধু নাগরিককে আইনের অধীন করা নয়, রাষ্ট্রকেও আইনের অধীন রাখা। নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে, দণ্ডাদেশ থাকলে আইন অনুযায়ী তার পরিণতি কার্যকর হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা যদি নাগরিককে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে, তবে সেই নিষ্ক্রিয়তারও জবাবদিহি থাকা দরকার।
নাগরিক রাষ্ট্রের অনুগ্রহভোগী নন; তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থার অধিকারী সদস্য। রাষ্ট্র তাঁর কাছ থেকে আইন মানার প্রত্যাশা করে, তাই রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আইনসম্মতভাবে তাঁর আবেদন নিষ্পত্তি করা।
এস কে সিনহার ঘটনায় মূল প্রশ্ন তাঁর অতীত রাজনৈতিক বা বিচারিক অবস্থান নয়। মূল প্রশ্ন হলো, একজন নাগরিকের দেশে ফেরার আবেদন আইন অনুযায়ী বিবেচিত হচ্ছে কি না।
একজন নাগরিক বিদেশে পালিয়ে যেতে চাইলে আইনসম্মতভাবে তাঁর দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু একজন নাগরিক যখন বিদেশ থেকে নিজ দেশে ফিরে আসতে চান, তখন তাঁকে পাসপোর্ট না দেওয়ার যুক্তি আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।
প্রশ্নটি তাই শুধু এস কে সিনহার ব্যক্তিগত দুর্ভোগের নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের মৌলিক প্রশ্ন। রাষ্ট্র কি নাগরিকের অধিকারকে নিজের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অধীন করবে, নাকি রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের অধিকার স্বীকার ও সুরক্ষার জন্য আইনের অধীন থাকবে?
আইনের শাসনের রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, আর রাষ্ট্রের ক্ষমতাও নিরঙ্কুশ নয়। আইন নাগরিকের অধিকার ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা—উভয়েরই সীমা নির্ধারণ করে। রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষমতার প্রয়োগ হতে হবে আইনসম্মত, যুক্তিসংগত ও জবাবদিহিমূলক।
