দুর্নীতি যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন কর্তব্য আর বিবেকের মধ্যে ফারাকটা ক্রমশ মুছে যেতে থাকে। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা যাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়, তাদের ভেতরেও কি কোথাও বিবেক আর মানবিকতা কড়া নেড়ে চলে? নেটফ্লিক্সের নতুন ওয়েব ছবি ‘গজব রাত’ এমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করায় দর্শককে। নীরজ পাণ্ডের রচনা ও প্রযোজনায় ছবিটি পরিচালনা করেছেন রীতেশ শাহ। অভিনয়ে মনোজ বাজপেয়ী, দিব্যা দত্ত, কিকু শারদা, নুসরত ভারুচা, রাজীব গুপ্ত, অদিতি শর্মা।
দিল্লির এক দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ আধিকারিক অজয় নির্ভিত (মনোজ)। ঘুষ নেওয়া, নিজের স্বার্থে আইনের অপব্যবহার করা এসবই তার রোজনামচার অঙ্গ। এমনই এক রাতে গাড়ি থেকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলা হয় গুরুতর আহত এক তরুণীকে। অজয়ের হাতে আসে তদন্তভার। কিন্তু ক্রমশ জটিল হতে থাকে ঘটনাপ্রবাহ। সিবিআই আধিকারিক নবীন মাধোক (অক্ষয় ওবেরয়), এনআইএ-র করণ গিল (সাকিব সালিম) এবং সমাজকর্মী নেহা প্রভু (শ্রদ্ধা দাস), প্রত্যেকেই মেয়েটিকে নিজেদের হেফাজতে নিতে চায়। কেউ বলছে সে রাশিয়ান ড্রাগ সাপ্লায়ার নাতালিয়া, কেউ দাবি করছে সে ইন্দো ব্রিটিশ গুপ্তচর ভেরোনিকা। শেষ পর্যন্ত জানা যায় মেয়েটি পেশায় সাংবাদিক।
আরিয়া সাহনি মানবতার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের খবর সংগ্রহ করেছিল, যার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে ক্ষমতার অলিন্দে। তাই যে করে হোক তাকে সরিয়ে দেওয়াই এখন একাধিক ব্যক্তির উদ্দেশ্য। অফার আসে অজয়ের কাছেও। কী সেই ষড়যন্ত্র যা ফাঁস হওয়ার ভয়ে এতজন মানুষ তাকে খুন করতে চায় রাতারাতি? একটা দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে সত্যের পক্ষে থাকা কতটা কঠিন, সেই প্রশ্ন তুলে ধরেছে এই ছবি। যে মেয়েটি এক ভয়াবহ অপরাধের খবর মানুষকে জানাতে চেয়েছিল, তার জীবনের কোনও মূল্যই নেই এই অন্ধকার সমাজে। সেই কাজে সাহায্য করার জন্য অন্তত একজন মানুষের তো নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠা প্রয়োজন।

ছবির আসল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারত এই বিবেকের জাগরণই। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় বিষয়কে কেন্দ্র করে যে টানটান থ্রিলার তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে কিছুটা খামতি থেকে গেল যেন। আসল সত্য সামনে আসতে বেশ অনেকটা সময় নিয়েছে। প্রথমার্ধের বড় অংশ জুড়ে চলে ছোটখাট তদন্ত, একের পর এক সন্দেহভাজনের পরিচয় খতিয়ে দেখা। মেয়েটির আসল পরিচয় খোঁজা এবং নতুন চরিত্রদের মধ্যেকার ইগো ও ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যস্ত রাখা হয়েছে দর্শককে। অথচ গল্পের কেন্দ্রে যে মেয়েটি, তাকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি যদি আরও আগে স্পষ্ট করা যেত, তা হলে হয়তো ছবির প্রতি আগ্রহ বাড়ত। রহস্য তৈরি করতে গিয়ে দর্শককে দীর্ঘ সময় অন্ধকারে রাখা হয়েছে।

গল্পের আসল উদ্দেশ্য বুঝতেই চলে গেছে অনেকটা সময়। অজয়ের চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছেন মনোজ। দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশের চরিত্রের স্বাভাবিক ধূর্ততা তাঁর অভিনয়ে ফুটে উঠেছে। কিন্তু এমন একজন মানুষের ভেতর নীতিবোধ জেগে উঠতে যে মানসিক টানাপোড়েনের প্রয়োজন হয় সেই দ্বন্দ্বকে তুলে ধরার সময় চিত্রনাট্য তাঁকে দেয়নি। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরূপে দিব্যার অভিনয় প্রশংসনীয়। অন্য চরিত্রেরা যথাযথ। চিত্রনাট্য আর একটু গোছানো হলে দু’ঘণ্টা তিন মিনিটের ছবি আরও টানটান হতে পারত।
