বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মধ্যেই শ্রমিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় মজদুর সংঘ। বাঁকুড়ার সরকারি আবগারি গুদামে মদ বোঝাই ও নামানোর কাজে যুক্ত শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি ঘিরে চারটি সংস্থাকে চিঠি দিয়ে আলোচনায় বসার আর্জি জানিয়েছে সংগঠনটি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বৈঠক না হলে আইন মেনে গণতান্ত্রিক শ্রমিক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে ওই চিঠিতে।
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটুর বিরুদ্ধে জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলনের জেরে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠত। শিল্পমহলের একাংশের মতে, যে কারণে ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরে গিয়েছিলেন শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীরা। সেই রাজনৈতিক বিতর্কের ছায়া এ বার যেন অন্য আঙ্গিকে ফিরছে এসেছে রাজ্যে, এমনটাই অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে।
শনিবার লেখা চিঠিটি পাঠানো হয়েছে আসকাস লজিস্টিক্স প্রাইভেট লিমিটেড, অ্যাসবোলাস গ্লোবাল প্রাইভেট লিমিটেড, ওয়েস্টওয়েল গ্যাসেস প্রাইভেট লিমিটেড এবং শ্যামধান ট্রেডার্স প্রাইভেট লিমিটেডের কর্তৃপক্ষকে। ভারতীয় মজদুর সংঘের বাঁকুড়া জেলা নেতৃত্বের তরফে জানানো হয়েছে, সরকারি আবগারি গুদামে মদভর্তি কার্টন ওঠানো ও নামানোর কাজে যুক্ত শ্রমিকেরা বর্তমানে কার্টন পিছু ২ টাকা ৪০ পয়সা পান। কাজের পরিশ্রম, শারীরিক শ্রমের চাপ এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচের কথা বিবেচনা করে সেই পারিশ্রমিক বাড়িয়ে পাঁচ টাকা করার দাবি তুলেছেন তাঁরা। শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও একাধিক দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। চিঠিতে আট ঘণ্টার কর্মদিবস চালু করা, নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজের জন্য আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত মজুরি দেওয়া এবং ন্যূনতম মজুরি-সহ অন্যান্য বিধিবদ্ধ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। শ্রমিকদের বক্তব্য ও দাবিদাওয়া নিয়ে সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকেরও আবেদন করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যে চার সংস্থার কর্তৃপক্ষকে যৌথ বৈঠকের ব্যবস্থা করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানসূত্র বার করার জন্যই এই উদ্যোগ। বৈঠকের দিন ও সময় লিখিত ভাবে দ্রুত জানানোর অনুরোধও করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৈঠক না হলে অথবা শ্রমিকদের অভিযোগের নিষ্পত্তিতে সন্তোষজনক পদক্ষেপ না করা হলে, শ্রমিকদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় গণতান্ত্রিক এবং আইনসম্মত আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে ভারতীয় মজদুর সংঘ, এমনই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। চিঠির প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছে আবগারি কমিশনার এবং বাঁকুড়ার সহকারী শ্রম কমিশনারের কাছেও। ফলে বিষয়টি শুধু সংস্থা ও শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, প্রশাসনিক স্তরেও নজরদারির দাবি উঠেছে।
রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে শ্রমিক সংগঠনগুলির ভূমিকা এবং শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় রাজ্যে শিল্প আনতে নানাবিধ উদ্যোগ শুরু করেছেন। সেই আবহে আরএসএসের শ্রমিক সংগঠনের এই হুঁশিয়ারি তাৎপর্যপূর্ণ। তবে দাবি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়, না কি শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের পথে হাঁটে সংগঠন, এখন সেটাই দেখার। ভারতীয় মজদুর সংঘের তরফে ওই চারটি সংস্থাকে চিঠিটি দিয়েছেন বাঁকুড়া জেলা সংগঠনের সহকারী সম্পাদক রুদ্রাক্ষ দত্ত। তিনি বলেন, ‘‘চার বছর হল শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। এই বিষয়ে আমরা শ্রম দফতরকেও জানিয়েছি। তার পরেই আমরা শ্রমিকদের স্বার্থে এই চিঠি লিখেছি। আমরা শিল্পকেও বাঁচাতে চাই, শ্রমিককেও বাঁচাতে চাই, কারণ এরা একে অপরের পরিপূরক। সিটুর জঙ্গি আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করা অনুচিত। কারণ ওরা পশ্চিমবঙ্গের শিল্প সংস্কৃতি ধংস করেছে।’’
