দুর্গাপুজোর ঢাকের আওয়াজ সবে থেমেছে। প্যান্ডেলে এখনও বাঁশ খোলা হচ্ছে, রাস্তায় ছড়িয়ে আছে শিউলিফুল। একদিকে মা চলে যাওয়ায় বিষাদের সুর আর অন্যদিকে লক্ষ্মীদেবী আগমনের আনন্দ। এর মাঝেই বাজার করা নিয়ে বাঙালির ব্যস্ততা তুঙ্গে। ফুলমালার দোকানে পদ্মের জন্য ভিড়, মুদির দোকানে খই-মুড়কি, নাড়ু-গুড়ের জন্য লম্বা লাইন। আর মাছের বাজারে চোখে পড়ছে চকচকে রুপোলি আলোর ঝলকানি। বিক্রেতারা হাঁক দিচ্ছেন, ‘‘জোড়া আছে, জোড়া!’’
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগে প্রতি বছরই বাজারে জোড়া ইলিশের খোঁজ শুরু হয়। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টা অনেকের কাছে অদ্ভুত মনে হলেও যে সব বাঙালি পরিবারের শিকড় পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের কারও কারও বাড়িতে লক্ষ্মীদেবীর ভোগে জোড়া ইলিশ দেওয়ার চল রয়েছে এখনও। অনেকেই নাক সিঁটকাবেন, শাস্ত্রেও এর তেমন কোনও উল্লেখ নেই। কিন্তু বাঙালির কাছে লক্ষ্মী তো শুধু বৈদিক মন্ত্রের দেবী নন, তিনি লোকের দেবী, ঘরের দেবী। তাঁর পুজো তাই শাস্ত্রে যতটা, তার চেয়ে বেশি লোকাচারে, বিশ্বাসে আর সংসারের মঙ্গলকামনায় বাঁধা।
অনেক বাড়িতে কোজাগরী পূর্ণিমায় জোড়া ইলিশকে শিব-পার্বতী বা লক্ষ্মী-নারায়ণের যুগল রূপে পজো করা হয়। ছবি: সংগৃহীত।
কেন জোড়া ইলিশ দেওয়ার চল?
ইলিশ প্রচুর ডিম দেয়। যে মাছ বেশি ডিম দেয়, তাকে উর্বরতা ও প্রাচুর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। জোড়া ইলিশ মানে দ্বিগুণ সমৃদ্ধি। আর সেই কারণেই মায়ের ভোগে ইলিশ জোড়া না দিলে কারও কারও কাছে পুজোটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অনেকে আবার কোজাগরী পূর্ণিমায় জোড়া ইলিশকে শিব-পার্বতী বা লক্ষ্মী-নারায়ণের যুগল রূপে পুজো করেন। বিশ্বাস করা হয়, জোড়া ইলিশ নিবেদন করলে সংসারে স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন অটুট থাকে, ঘরে শ্রীবৃদ্ধি হয়। কোনও কোনও বাড়িতে বলা হয়, আশ্বিন মাস মানে ইলিশের ভরা মরশুমের শেষ। সারা বর্ষা নদী যে সম্পদ দিয়েছে, তার জন্য প্রকৃতি ও দেবীকে ধন্যবাদ জানাতেই পূর্ববঙ্গীয় রীতি অনুযায়ী এই ভোগ দেওয়ার প্রথা চলে আসেছে বছরের পর বছর ধরে।
পুজোর আচার অনুযায়ী বাজার থেকে একই মাপের দুটো ইলিশ আনতে হয়, একটু বড়-ছোট হলে চলবে না। জোড়া হতে হবে নিখুঁত। অনেক বাড়িতে ইলিশজোড়াকে নতুন শাড়ি-ধুতি, সিঁদুর-চন্দন পরিয়ে, পান-সুপারি দিয়ে বরণ করা হয়। তার পর লক্ষ্মীর সামনে নিবেদন। পুজোশেষে সেই ইলিশই হয় প্রসাদ। তবে জোড়ের একটি মাছ ভেঙে খাওয়া যায় না, দুটোই রান্না করতে হয়।
তেল-মশলা ছাড়াই তৈরি হয় ভোগের ইলিশ। ছবি: সংগৃহীত।
প্রসাদের ইলিশ রান্নারও আবার নিয়ম আছে। সর্ষে দিয়ে ভাপা কিংবা কড়া করে ভেজে খাওয়া চলবে না! কাঁচা মাছ দিয়েই বানানো হয় পাতলা ঝোল। রান্নায় নামমাত্রও তেলের ব্যবহার হয় না। খুব সামান্য উপকরণ দিয়ে এই তৈরি এই ভোগের ইলিশের ঝোলের স্বাদ হয় অসাধারণ।
উপকরণ:
২টি ইলিশ (রিং করে কাটা)
২টি বেগুন (ডুমো করে কাটা)
১ টেবিলচামচ হলুদ
স্বাদমতো নুন, গোলমরিচগুঁড়ো
প্রণালী:
প্রথমে ইলিশ মাছে নুন, হলুদ মাখিয়ে রেখে দিন। এ বার বড় একটি কড়াইয়ে বেশ খানিকটা জল গরম করে তাতে নুন, হলুদ দিয়ে ফুটিয়ে দিন। ঝোল ফুটে উঠলে বেগুনগুলি দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। বেগুন খানিকটা সেদ্ধ হয়ে গেলে মাছগুলি দিয়ে আবার ঢেকে দিন। মাছ সেদ্ধ হয়ে হলে শেষে বেশ খানিকটা গোলমরিচের গুঁড়ো ঝোলে মিশিয়ে দিলেই তৈরি লক্ষ্মীপুজো স্পেশ্যাল ইলিশের ঝোল।
