দেশের রাজনীতিতে আলোচিত তিনটি দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও গণঅধিকার পরিষদ। বিগত সময়ে তারা একসঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও সময়ের পরিক্রমায় তাদের পথ এখন আলাদা। ডাকসু’র সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেৃত্বত্বাধীন গণঅধিকার এখন ক্ষমতাসীন বিএনপি’র সঙ্গে জোটসঙ্গী হয়ে সরকারে। অন্যদিকে ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর জন্ম নেয়া নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বাধীন এনসিপি বিরোধী দল জামায়াতের সঙ্গে গড়েছে ঐক্য। সম্প্রতি জামায়াত-এনসিপি’র নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক বাহাসে জড়িয়েছেন গণঅধিকার নেতারা। একে অপরকে ঘায়েল করতে দিচ্ছেন আক্রমণাত্মক বক্তব্য। ফেসবুক, টকশো, কিংবা রাজনৈতিক-সামাজিক অনুষ্ঠানে জড়াচ্ছেন কাদা ছোড়াছুড়িতে। সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে একহাত নিচ্ছেন দলগুলোর শীর্ষ নেতারা।
এই বাহাসের সূত্রপাত এনসিপি’র উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে। সার্জিস ফেসবুকে পোস্টে লিখেছিলেন, ‘একটা ন্যাশনাল পার্টির মুখপাত্র ‘উপ-সচিব’ পদমর্যাদায় চাকরি করবে! পার্টি কতোটা দেউলিয়া হলে হীনম্মন্যতা থেকে নেতারা এই কাজ করতে পারে!’ জবাবে গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ফারুক হাসান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে রাজনীতি ছেড়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার পরামর্শ দেন। তার নিয়োগ নিয়ে সারজিস আলমের ফেসবুক পোস্টের পর দু’জনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে আসে। ফারুক হাসান লেখেন, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সারজিস আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কিনা তা যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে! একটি প্রতিষ্ঠানের বোর্ড অব ডাইরেক্টরসের পরিচালক যারা থাকেন তারা সরকারের গ্রেডভুক্ত কোনো আমলা না। এটা বোঝার কিংবা জানার জন্য পিএইচডি করার প্রয়োজন নেই, এটা জেনারেল নলেজের মধ্যে পড়ে।’
গত ১৪ই অক্টোবর এনসিপি’র মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘বিএনপির গণঅধিকার পরিষদ শাখার মাঝারি সারির কর্মী ফারুক হোসেনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পড়াশোনা থাকা সত্ত্বেও, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে তাকে বিদ্যুৎ খাতের পরিচালক নিয়োগ দেয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। সবার জ্ঞাতার্থে বলি, গত এক বছরে গুলশান অফিসে তিনি বিদ্যুৎ বিষয়ে পিএইচডি, বিরোধী দলকে গালাগালি বিষয়ে মাস্টার্স এবং কীভাবে বিদ্যুতের বিল বাড়িয়ে গুলশান অফিসের খরচ জোগানো যায়, সে বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেছেন! এমন বহুমুখী যোগ্যতার পর তার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই তো অন্যায়! যারা এ কাজ করে যাচ্ছেন, তারা সাংবিধানিকভাবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।’
এরপর গত ১৫ই অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ও গণঅধিকার সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, ছাত্রলীগের ধান্দাবাজ, রাজনৈতিক টাউট, চরিত্রহীন লম্পট, মানুষের টাকা মেরে দেয়া এই সমস্ত চোর-ছ্যাঁচড়া, বাটপাড় ও টাউটগুলো ক্ষমতার মধুর জন্য সব জড়ো হয়েছে এনসিপিতে। আমি বলছি, আজকে লিখে নেন এই এনসিপি’র পরিণতি হবে ফ্রিডম পার্টির মতো। জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমি বললাম, জামায়াতের যেই আস্ফালন, এই আস্ফালনের কারণে আওয়ামী লীগকে এ দেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করা হবে। জামায়াত যদি একাত্তরে গণহত্যা, গণধর্ষণ ও লুটপাট করে মানবতাবিরোধী অপরাধের চরম অপকর্ম করেও বাংলাদেশের বিরোধী দল হতে পারে, রাজনীতি করতে পারে, তাহলে আওয়ামী লীগ কেন পারবে না?
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমের ছাত্রলীগের মিছিলে অংশ নেয়ার একটি পুরনো ছবি প্রকাশ্যে এনে তার সমালোচনা করেন নুর। একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমাদের মিছিলে হামলা করার জন্য ছাত্রলীগ মিছিল নিয়ে আসছে। তারা আমাদের মিছিল প্রতিহত করবে। ওই মিছিলে লাল কালি দিয়ে একটা ছবি মার্ক করা। আব্দুল কাদের পোস্ট দিয়েছে-লাল মার্ক করা একটা ছেলে আছে, সাদিক কায়েম। যিনি আজকে ডাকসুর ভিপি।’
এরপর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের মিসাইলে মগবাজার আর বাংলামোটর তছনছ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন গণঅধিকারের সাবেক নেতা রাশেদ খান। সম্প্রতি আরেক পোস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করায় সারজিস আলমকে বহিষ্কার এবং হাসনাত আব্দুল্লাহকে শোকজ করা হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন রাশেদ খান। তার দাবি, তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তাদের বহিষ্কার ও শোকজ করেন।
এদিকে গত ১৮ই আগস্ট ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঠালিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ড. ফয়জুল হক নুর-রাশেদকে ‘রাজনৈতিক ভাইরাস’ আখ্যা দেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নুরুল হক নুর ও রাশেদ খান ‘রাজনৈতিক ভাইরাস’। বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কারণে যা বলতে চান না, তা নুর-রাশেদকে দিয়ে বলানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এর আগে ২২শে আগস্ট জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে নুর ও রাশেদের বক্তব্যের জবাব দেন বাউফলের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি অতীতে যারা জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছিল, তাদের পরিণতির প্রসঙ্গ টানেন। রাজধানীর সবুজবাগ-মুগদা জোনের উদ্যোগে আয়োজিত দলের এক রুকন সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই বক্তব্যের ভিডিওতে ড. মাসুদ বলেন, ‘নতুন করে শুনতেছি, বিএনপি যদি আমাদের নিষিদ্ধ করে দেয়, তো কী হবে? বলি, আমাদের নিষিদ্ধ করলে কী হবে, সেটা পরে দেখেন, আগে দেখেন, যারা নিষিদ্ধ করেছিল, তাদের কী হয়েছে?’
এদিকে, গত ১৪ই অক্টোবর সকালে এক ফেসবুক পোস্টে গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ ৬ আসনের বিনিময়ে এনসিপি নতুন বন্দোবস্ত জামায়াতের কাছে বিক্রি করে বলে মন্তব্য করেন। তিনি লেখেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে কিংস পার্টি এনসিপি। শুরুতে তারা নিরপেক্ষতার দাবি তুলে নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে। কিন্তু সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার হয় যে, এরা মূলত জামায়াত নিয়ন্ত্রিত একটা প্রক্সি সংগঠন। এর আগের দিন ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সরকারের ভেতরে থাকা জামায়াতের ‘গুপ্ত’রা জড়িত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আবু হানিফ।
