ডিজেলের দাম বাড়ায় সরকার বাসভাড়া সমন্বয় করেছে। তবে সেই সুযোগে সিএনজিচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে আগে ১০ টাকা ভাড়ার জায়গায় এখন ১৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অথচ সরকারের ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত শুধু ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের জন্য। গ্যাসচালিত বাসের ভাড়া বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ফলে জ্বালানির দাম না বাড়লেও সিএনজিচালিত বাসে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের।
সম্প্রতি রাজধানীর নতুনবাজার থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত রাইদা এন্টারপ্রাইজের একটি বাসে যাতায়াত করেন বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাসের কন্ডাক্টর তার কাছ থেকে ১৫ টাকা ভাড়া নিয়েছেন। অথচ আগে এই পথে ভাড়া ছিল ১০ টাকা। একবারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। শুধু এই বাস নয়, অন্য বাসগুলোতেও একই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
আশরাফুল ইসলাম আরও বলেন, হঠাৎ তার চোখ পড়ে বাসচালকের ড্যাশবোর্ডের দিকে। সেখানে সক্রিয় অবস্থায় সিএনজির মিটার দেখতে পান তিনি। তার ভাষায়, গ্যাসচালিত বাসে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া নেওয়া ভয়াবহ প্রতারণা। এ বিষয়ে কন্ডাক্টরকে প্রশ্ন করলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। বাংলাদেশে তেলের দাম বাড়লে ঢাকার সব বাস তেলে চলে, আর গ্যাসের দাম বাড়লে সব বাস গ্যাসচালিত হয়ে যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ও বাসের সহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক বাস এখনো সিএনজিতে চলে। এসব বাস রাতে ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নেয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাইদা এন্টারপ্রাইজ ও গ্রেট তুরাগের বেশ কিছু বাস দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর সিফাত সিএনজি ফিলিং স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে।
১২ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা, অতিরিক্ত আদায় ৩ টাকা
গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায়। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়। পরদিন থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ওঠে। পরে ২২ সেপ্টেম্বর সরকার বাসভাড়া সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার পরও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ বন্ধ হয়নি।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে। দূরপাল্লার বাসে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বেড়েছে ১৭ পয়সা। তবে এই বৃদ্ধি গ্যাসচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
সরকারি সিদ্ধান্তে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়লেও কোনো কোনো পথে একবারে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আগে যেখানে ১০ টাকা ভাড়া ছিল, সেখানে এখন ১৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এতে ভাড়া বেড়েছে ৫০ শতাংশ। অথচ সরকার নির্ধারিত ভাড়া বৃদ্ধির হার প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ১৭ পয়সা।
রাইদা এন্টারপ্রাইজের বাসগুলো রাজধানীর দিয়াবাড়ী-পোস্তগোলা-দিয়াবাড়ী রুটে চলাচল করে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে রুটটি এ-৩১৭ নম্বরে পরিচিত। দিয়াবাড়ী-উত্তরা-কুড়িল-রামপুরা-খিলগাঁও ফ্লাইওভার হয়ে পোস্তগোলার দূরত্ব ২৭ দশমিক ৩ কিলোমিটার। এই রুটে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ভাড়া ৭৪ টাকা।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, আশরাফুল ইসলাম নতুনবাজার থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত যে দূরত্বে যাতায়াত করেছেন, তা ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার। রামপুরা স্টপেজ পর্যন্ত দূরত্ব ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার। ওই দূরত্বের জন্য সর্বোচ্চ ১২ টাকা ভাড়া নেওয়ার কথা। কিন্তু তার কাছ থেকে ১৫ টাকা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে ৩ টাকা। এর ওপর বাসটি ছিল সিএনজিচালিত।
রাইদা এন্টারপ্রাইজের বাসের কন্ডাক্টর সেলিম বলেন, তারা সরকারি ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী ভাড়া নেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাড়ার হিসাব বেজোড় হওয়ায় সব সময় খুচরা টাকা পাওয়া যায় না। সে কারণে ভাড়া কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
আশরাফুল ইসলামের মতো রাজধানীর বিভিন্ন রুটে যাতায়াতকারী আরও অনেক যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কখনো খুচরা টাকার অজুহাতে, আবার কখনো হিসাবের ভুল দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে, একটি বাসে ৩০ জন যাত্রী নতুনবাজার থেকে রামপুরায় নামলে ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার যাত্রায় প্রত্যেকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩ টাকা করে নেওয়া হলে মোট ৯০ টাকা বেশি আদায় হতে পারে।
আমিনুল ইসলাম নামের এক যাত্রী জানান, তিনি উত্তরার আজমপুর এলাকার বাসিন্দা। অফিসের কাজে প্রায়ই উত্তরা থেকে নদ্দা ও নতুনবাজার এলাকায় যাতায়াত করেন। সম্প্রতি তিনি লক্ষ্য করেছেন, এই রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন বাসের ভাড়া বেড়েছে। আগে রাইদা পরিবহন, ভিক্টর ক্ল্যাসিক ও অনাবিল পরিবহনে উত্তরা থেকে নদ্দা কিংবা নতুনবাজার পর্যন্ত ভাড়া ছিল ২০ টাকা। বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৩০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, উত্তরা আজমপুর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে আসাদগেট ও খামারবাড়ি রুটে চলাচলকারী ভিআইপি পরিবহনের ভাড়া ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরা থেকে শাহবাগ পর্যন্ত চলাচলকারী এয়ারপোর্ট স্পেশাল সার্ভিস বাসের ভাড়াও ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট, বাড়তি ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত বাসে
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ২২ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনে ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া সমন্বয়ের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাস ও মিনিবাসের দৃশ্যমান স্থানে নতুন ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে যাত্রীরা সংশ্লিষ্ট রুটের অনুমোদিত ভাড়া যাচাই করতে পারবেন।
প্রজ্ঞাপনে গ্যাসচালিত বাসের ভাড়া বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাই ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর নির্ধারিত নতুন ভাড়া সিএনজিচালিত বাসে কার্যকর করার কোনো ভিত্তি নেই। কোনো বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হলে তা সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।
এর আগেও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। গত ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সরকারি সিদ্ধান্ত আসার আগেই ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে সরকার ভাড়া সমন্বয় করলেও নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ সামনে আসে।
সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। ২২ সেপ্টেম্বর এক বৈঠকে তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক পয়সাও বেশি নেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে জরিমানা করা হবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের রুট পারমিট বাতিল করা হতে পারে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সিএনজির দাম বাড়েনি। তাই সিএনজিচালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের জানাতে সাংবাদিকদের আহ্বান জানান তিনি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন।
শহরে ন্যায্য ভাড়া নিশ্চিত করতে ভাড়া বাড়ানোর দাবি মালিক সমিতির
সিএনজিচালিত বাসে ডিজেলচালিত বাসের নির্ধারিত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, সিএনজিচালিত হাতে গোনা কিছু বাস রয়েছে, যেগুলো তারা হিসাবের মধ্যে ধরছেন না। যেসব রুটে সিএনজিচালিত বাস চলে, সেসব রুটে ভাড়া বাড়ানো হয়নি। মালিক সমিতি কিংবা বিআরটিএ কেউই ভাড়া বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়নি। সিএনজিচালিত বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি বাসে ভালো সেবা নিশ্চিত করতে ভাড়ার কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে প্রতি কিলোমিটারে নির্ধারিত ভাড়া বাড়িয়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ টাকা করা দরকার। বর্তমান ভাড়ায় পরিবহন ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন। এ কারণে ভালো মানের বাস রাস্তায় নামানো এবং যাত্রীদের উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কম ভাড়ায় গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করতে চাইলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে, যেমনটি বিআরটিসির ক্ষেত্রে করা সম্ভব। বেসরকারি পরিবহন মালিকদের পক্ষে নিজেদের বিনিয়োগ, ঋণ ও পরিচালন ব্যয় সামলে এ ধরনের সেবা দেওয়া কঠিন।
সাইফুল আলম আরও বলেন, ২০২১-২২ সালে বাসভাড়া নির্ধারণের সময় ডলারের দাম ছিল ৮৬ থেকে ৮৮ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ১২৫ থেকে ১২৬ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাসের ইঞ্জিন, যন্ত্রাংশ, লুব্রিকেন্টসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম বাড়ায় এসব পণ্যের মূল্য ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় করা হয়নি।
তিনি জানান, গতবার ভাড়া সমন্বয়ের সময় মালিকদের পক্ষ থেকে বাড়তি ব্যয় বিবেচনায় অন্তত ২০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছিল। সে হিসাবে ৩২ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৪ পয়সা সমন্বয় করা হয়। এবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও ভাড়া সমন্বয়ের ক্ষেত্রে মালিকদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
সাইফুল আলম বলেন, যাত্রীরা যাতে কম খরচে স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে ভালো সেবা পান, সেটিই তাদের প্রত্যাশা। এ জন্য শুধু ভাড়া বাড়ানোর পরিবর্তে সরকারকে নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। বাসের ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে কর কমানো, ঋণের সুদহার হ্রাস এবং নগর পরিবহন খাতে সহজ শর্তে ৫ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার এসব সহায়তা দিলে পরিবহন পরিচালনার ব্যয় কমবে, ভাড়ার ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে এবং যাত্রীদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করা যাবে।
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, এতগুলো কোম্পানির বাস কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। তার মতে, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করা সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। এতে বিভিন্ন মালিক ও কোম্পানিকে নির্দিষ্ট রুটের আওতায় এনে বাস পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ফলে অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেলে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হয়। বাসেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির বিকল্প নেই। ফ্র্যাঞ্চাইজির আওতায় ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু হলে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও কমে আসবে।
এমএ
