বাংলাদেশে বর্তমানে এক কোটিরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং তাদের চোখ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। মানবদেহে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে চোখ, কিডনি ও মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে চোখে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, হিমোরেজ এবং রেটিনা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো স্থায়ী অন্ধত্ব সৃষ্টিকারী জটিলতা দেখা দিতে পারে। ডায়াবেটিসের সাথে চোখের শতভাগ নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই চোখে কোনো দৃশ্যমান সমস্যা বা উপসর্গ না থাকলেও প্রত্যেক ডায়াবেটিক রোগীর বছরে অন্তত দুইবার অর্থাৎ প্রতি ছয় মাস অন্তর নিয়মিত চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে চোখ পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক।
ডায়াবেটিস ছাড়াও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চোখের লেন্স ঘোলা হয়ে ছানি পড়ে। তবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের মতো ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বয়সের অনেক আগেই অল্প বয়সে ছানি পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ২০২০ সালের জাতীয় অন্ধত্ব জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানুষের দৃষ্টিশক্তি হারানোর সবচেয়ে প্রধান কারণ হলো এই ছানি, যা সঠিক সময়ের অপারেশনের মাধ্যমে পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব।
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, রাতে পর্যাপ্ত না ঘুমানো এবং ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে দেশের সর্বস্তরের মানুষের চোখের জটিল সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দার দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকার ফলে মানুষের চোখের স্বাভাবিক পলক পড়ার অটোমেটিক রিফ্লেক্স ব্যাহত হয়। এতে চোখ শুকিয়ে যাওয়া বা ড্রাই আই, চোখে অস্বস্তি এবং দ্রুত দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তাছাড়া কাজের সময় উপযুক্ত আলোর অভাবও চোখের দৃষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শিশুদের চোখের সুরক্ষায় অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে অপরিপক্ক বা প্রিটর্ম এবং কম ওজনের নবজাতকদের জন্মের তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে চোখের রেটিনা পরীক্ষা করানো উচিত, নইলে পরবর্তী সময় স্থায়ী অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সৌন্দর্যবর্ধক কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর উপায়ে তা পরিষ্কারের ফলে চোখে মারাত্মক ইনফেকশন ও অন্ধত্বের ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া ছোঁয়াচে রোগ চোখ ওঠা প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
সামগ্রিকভাবে চোখ ভালো রাখতে যেকোনো সাধারণ মানুষ, স্কুলগামী শিশু এবং চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তির বছরে অন্তত একবার দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা উচিত। নিয়মিত চিকিৎসা ও সচেতনতাই পারে আমাদের মূল্যবান দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষিত রাখতে।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সহযোগী অধ্যাপক
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা
