আমি বিশ্বাস করি, সরকার থেকে আমাদের চেষ্টা থাকবে। এ ধরনের কোনো আয়োজন যদি কেউ বেসরকারি খাত থেকে এগিয়ে আসেন, সহযোগিতা করার ব্যাপারে, আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব।
প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় সাত মাস ধরে বেশকিছু কাজ করছি। এ কনক্লেভে অংশ নেয়া বক্তারা যে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেছেন আমরা সেগুলো নিয়ে এরই মধ্যে কাজ করছি। আমাদের একটা অথরিটি (কর্তৃপক্ষ) আছে, আরবান ডেভেলপমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইউডিডি)। যারা প্রথমবারের মতো ১০ বছরের একটা পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মাধ্যমে সারা দেশে কাজ করব। প্রথমে আমরা মেট্রোপলিটন সিটিতে কাজ করছি। এরপর বড় শহর থেকে একদম উপজেলা পর্যায়ে যেন প্রকৃত অর্থে একটা মাস্টারপ্ল্যান করা যায় সেটা দেখব। কোথায় কী হওয়া উচিত সেভাবে জোনিং করব। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া কাজ করা মানে একটা লক্ষ্যে চারটা তীর ছোড়ার মতো, কোনোটায় যেন লাগে। কিন্তু আমরা প্রিসাইজলি (নির্দিষ্টভাবে) কাজ করতে চাচ্ছি। সে জন্যই আমরা ইউডিডিকে শক্তিশালী করছি এবং এ বিভাগটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে চাই।
এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বলতে হয়। যখন প্রকৃত এবং যথেষ্ট তথ্য হাতে থাকে, তখন ঠিকমতো পরিকল্পনা করা যায়। শেষ যে আদমশুমারি হয়েছে সেটার অনেকদিন হয়ে গেছে। আমাদের আরেকটা উপযুক্ত শুমারি করা উচিত যাতে সেটার ভিত্তিতে পরিকল্পনাটা করতে পারি।
আমরা এরই মধ্যে বেশকিছু কাজ হাতে নিয়েছি। এখন চেষ্টা করছি আর্কিটেকচার, স্ট্রাকচারাল ও ইলেক্ট্রো প্ল্যানিং সবকিছু মিলিয়ে যেন প্ল্যানটা দেয়া হয়। সেটা অনুমোদন দেয়ার পর, বিল্ডিংয়ের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট পেতে হলে যারা ডিজাইনটা করেছেন তাদের সার্টিফাই করে দেয়া হবে যে হ্যাঁ, বিল্ডিংটা ঠিকমতো তৈরি হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, আমাদের রাউজক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে এলাকাগুলো আছে যেমন ধানমন্ডি, সেগুলোর পরিকল্পনা পাস করে দিয়েছে রাজউক। এর বাইরের এলাকায় পরিকল্পনা ছাড়া অনেক বিল্ডিং আছে। আমরা এখন সেগুলো শনাক্ত করছি।
দুঃখজনক হলেও শুধু গুলশান, বনানী, বারিধারার লেক এবং হাতিরঝিল লেক নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ছয়বার আমাদের সঙ্গে মিটিং করেছেন। কীভাবে আমরা পরিবেশটাকে ঠিক করতে পারি? সেখানে উচ্চবিত্ত বা ধনী মানুষের বসবাস, ৪ হাজার ৩০০ বাড়িঘর আছে। এর মধ্যে বোধহয় ৭০-৮০ শতাংশ বাড়িঘরে প্ল্যানিংয়ের সময় যে সেপটিক ট্যাংক থাকার কথা ছিল, সোকওয়েল থাকার কথা ছিল তারা সেগুলো করেনি। নামিদামি ডেভেলপাররা বিল্ডিং করে আসছেন, কিন্তু তারা বর্জ্য পরিশোধনের জন্য এসটিপিতে যাননি। আমরা চেষ্টা করছি সবাইকে সচেতন করতে। এ নিয়ে গুলশান, বনানী, বারিধারা সোসাইটির সঙ্গে তিন-চারবার মিটিং করেছি। আমাদের রাজউক চেয়ারম্যান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা ওয়াসার এমডি ছিলেন এবং আমিও মিটিং করেছি। আমি বলেছি, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। গুলশান, বারিধারা আমাদের ডিস্টিংগুইশড এরিয়া; সেখানকার লেকের পানিই যদি আমরা ঠিক করতে না পারি, সারা বাংলাদেশ কীভাবে ঠিক করব?
আমাদের চেষ্টা আছে। আমি আপনাদের বলতে পারি, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর যে দিকনির্দেশনা আছে। সরকার অত্যন্ত রিসেপটিভ। আমরা বিশ্বাস করি, আমরা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত একটা সরকার। আপনাদের যেকোনো আইডিয়া যা দেশের মঙ্গলের জন্য আমরা তা নিয়ে কাজ করতে রাজি আছি। আমাদের সহায়তা করুন। যেকোনো পারমর্শ দিলে যদি আমরা দরকারি মনে করি তাহলে অবশ্যই তা গ্রহণ করব।
অনেকগুলো কাজ হচ্ছে। রাজউকের মতো আমরা নতুন আরো ছয়টা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি করেছি গত সাত মাসে। তার মধ্যে আছে ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও বরিশাল। এর আগে আরো চারটা ছিল। আমরা পর্যায়ক্রমে বগুড়া নিয়ে কাজ করছি। ডেভেলপমেন্ট অথরিটি না থাকলে দেখা যায় সিটি করপোরেশনই প্ল্যান দিচ্ছে, তারাই কাজ করছে। সেখানে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সটা থাকে না। আমাদের ঢাকা শহরেই অনেক জায়গা আছে, যেমন বছিলা। অনেক ইউনিয়ন থেকে প্ল্যান পাস করা হয়েছে। এগুলোকে আমরা একটা সামগ্রিক আইনি কাঠামোয় আনার চেষ্টা করছি। যারা অলরেডি প্ল্যান ছাড়া বিল্ডিং করেছেন বা প্ল্যান নিয়ে সেটা ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, সেটার জন্য একটা বিধিমালা তৈরি করছি। মাসখানেকের মধ্যেই হয়তো মন্ত্রিসভায় উঠবে। এটি পাস হলে সুপারভিশন আইনটাকে আরো শক্তিশালী করতে পারব।
মর্টগেজ নিয়ে কথা হয়েছে। সত্যিকার অর্থেই যদি মাস লেভেলে আমরা গৃহায়ন করতে চাই তাহলে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট একটা বিরাট ফ্যাক্টর হবে। বেশির ভাগ উন্নত দেশে ৩০ বছরের জন্য মর্টগেজ পাওয়া যায়। সে ধরনের সুবিধা ছাড়া মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন তৈরি করা কঠিন। এ ধরনের কোনো আয়োজনে যদি প্রাইভেট সেক্টর থেকে এগিয়ে আসেন, সেখানে সহযোগিতা করতে সরকার ও আমাদের চেষ্টা থাকবে।
আমি বিশ্বাস করি, সরকার থেকে আমাদের চেষ্টা থাকবে। এ ধরনের কোনো আয়োজন যদি কেউ বেসরকারি খাত থেকে এগিয়ে আসেন, সহযোগিতা করার ব্যাপারে, আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব।
বেসরকারি খাতের আবাসন নীতিমালায় বেশ সমস্যা ছিল। আমরা সেটা নিয়ে যথেষ্ট আলাপ-আলোচনা এবং সবার সঙ্গে পরামর্শ করে নতুন নীতিমালা করেছি। সেখানে বলা হয়েছে, প্রাইভেট সেক্টরে আবাসন পাস করতে হলে যেটা দেয়া হয়েছে, সেটার মধ্যে থেকেই করতে হবে। আগের কাজটি ঠিকমতো হয়েছে কিনা সেটার ওপর নির্ভর করেই নতুন প্ল্যান পাস হবে। চেষ্টা করছি তাদেরও আইনি কাঠামোয় আনতে, যাতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ না হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাসযোগ্য ১৭৩টা শহরের মধ্যে ১৭১তম অবস্থানে আছে ঢাকা। এ শহরের উন্নতিতে আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। কিন্তু এটাও বাস্তবতা যে আমরা সত্যিকার অর্থেই অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটা শহরে আছি। যথাযথ পরিকল্পনা এবং সব খাতের অবদান ছাড়া সে চেষ্টা সফল করা অত্যন্ত কঠিন। বলতে সহজ কিন্তু বাস্তবে করা অনেক কঠিন।
গত ৫ তারিখে বসতি দিবস ছিল। সেখানে প্রধানমন্ত্রী একটা কথা বলেছেন, সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও টেকসই আবাসন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা উন্নত বিশ্বের জন্য যতটা সহজ বাংলাদেশের মতো জনবহুল রাষ্ট্রে অতটা সহজ নয়। তবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে যেন আমরা আরো সুস্থভাবে ও পরিবেশ রক্ষা করে আবাসন নীতিমালা তৈরি করতে পারি। জনগণের জন্য আরো ভালো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা যদি সচেতন হই, সবার চিন্তায় পরিবর্তন আনতে পারি এবং অবদান রাখতে পারি, তাহলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব।
জাকারিয়া তাহের: মন্ত্রী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে]
