বর্তমানে আমাদের সার্কুলার ইকোনমি কার্যক্রমের আওতায় ৫৭টি শিল্প-কারখানা চালু রয়েছে। আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে আরো সাতটি কারখানা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গ্রিন ডায়ালগের বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনেছি। অতীতেও বিভিন্ন আলোচনা ও সংবাদমাধ্যমে এসব বিষয়ে অনেক পরামর্শ এসেছে। এখন আমাদের ভাবতে হবে কীভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায়।
আমি মূলত কাজের মানুষ। কাজ করাই আমার প্যাশন। বক্তৃতা-বিবৃতির চেয়ে কাজের মাধ্যমে অবদান রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ব্যাংকাররা আমাদের অর্থায়ন করেছেন, ঋণ দিয়েছেন এবং প্রতিনিয়ত সহযোগিতা করছেন। তাদের সহায়তা ও নিজেদের প্রচেষ্টায় আমরা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছি। আমি বিশ্বাস করি, কাজের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো ভাগ করে নেয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। শিল্পের উৎপাদন বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা, বর্জ্য কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করাও জরুরি। সবুজ উদ্যোগ শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবেলার অংশ।
এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর করা যায়।
ড. ফাহমিদা খাতুন বারবার যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তা হলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও উদ্যোগ থেকে আমাদের জন্য কতটা কার্যকর অর্থায়ন আসছে এবং কতটা অর্থায়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের শিকার হলেও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের অবদান তুলনামূলকভাবে কম। অথচ অন্য দেশগুলোর নিঃসরণের প্রভাবও আমাদের বহন করতে হচ্ছে।
কয়েক দিন আগে সিঙ্গাপুরে গিয়ে শুনেছি, ইন্দোনেশিয়ায় বন ও অন্যান্য স্থানে আগুন জ্বালানোর ফলে আশপাশের দেশগুলোতেও দূষণের প্রভাব পড়ছে। পরিবেশদূষণের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। একজনের কর্মকাণ্ডের কারণে অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখা যায়। আমি আমাদের নেয়া কয়েকটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরতে চাই।
মেঘনা গ্রুপে শিল্প, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহারে আমরা বিনিয়োগ করছি। টেকসই উন্নয়ন আমাদের কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা বিশ্বাস করি, শিল্পের প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব যখন তা প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তাই নতুন শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা থেকে উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার জলবায়ু ও মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়টি বিবেচনায় রাখি।
২০০৭ সালের দিকে আমরা পরিত্যক্ত কাগজ ও পেপার কার্টন সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগে একটি পেপার ফ্যাক্টরি স্থাপন করি। মোহাম্মদ আনিস ভাই তখন ফ্যাক্টরিটি উদ্বোধন করেছিলেন। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আমরা সংগ্রহকারীদের সঙ্গে কাজ করছি; দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পরিত্যক্ত কাগজ সংগ্রহ করে কারখানায় আনা হচ্ছে। আগে এ কার্যক্রম মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলেও এখন খুলনা, বগুড়া, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কাগজ সংগ্রহ করা হয়। দেশের অন্যান্য স্থানেও এ ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে।
সংগৃহীত কাগজ পুনর্ব্যবহার করে আমরা নতুন কাগজ তৈরি করছি, যা কার্টনসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার করা যায়। প্রক্রিয়ায় অবশিষ্ট কিছু বর্জ্য বয়লারের জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগানো হয়। এভাবে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুবিধাও পাওয়া যাচ্ছে। কাগজের বর্জ্যের বিভিন্ন অংশ ছোট বয়লারে এবং কয়লার সঙ্গে মিশিয়েও ব্যবহার করা হয়।
একইভাবে পিইটি রেজিনের বোতল পুনর্ব্যবহারে আমরা কাজ করছি। আগে এসব বোতলের একটি অংশ চীনে পাঠানো হতো। বর্তমানে দেশে এগুলোর প্রাপ্যতা বেড়েছে। ক্ষুদ্র সংগ্রহকারীদের মাধ্যমে বাজার থেকে বোতল সংগ্রহ করে আমরা রিসাইকেল করছি। কিছু পুনর্ব্যবহৃত উপাদান নিজেদের কাজে লাগাচ্ছি, অন্য কারখানাগুলোকেও সরবরাহ করছি।
ইউরোপে আমরা এক-দেড় টন ধারণক্ষমতার বড় জাম্বো ব্যাগ রফতানি করি। কয়েক বছর ধরে সেখানে পুনর্ব্যবহৃত উপাদান ব্যবহারের জন্য উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। রফতানির ক্ষেত্রে এসব ব্যাগে ২০ শতাংশ রিসাইকেল উপাদান ব্যবহার বাধ্যতামূলক; ৩০ শতাংশ ব্যবহার করলে আরো বেশি প্রণোদনা পাওয়া যায়। আমাদের পুরনো জাম্বো ব্যাগ সংগ্রহ করে পরিষ্কার করার পর সেগুলো থেকে নতুন দানা তৈরি করা হয়। পরে সেই উপাদান নতুন ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বর্তমানে আমাদের সার্কুলার ইকোনমি কার্যক্রমের আওতায় ৫৭টি শিল্প-কারখানা চালু রয়েছে। আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে আরো সাতটি কারখানা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
আমাদের শিট ক্রাশিং কার্যক্রমে উৎপাদিত উপাদান পশুখাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এবং সেখান থেকে পাওয়া তেলও পুনর্ব্যবহার করা হয়। প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন ছোটখাটো বর্জ্য বয়লারের মাধ্যমে কাজে লাগানো হয়। এভাবে বর্জ্য প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) অর্থায়নে বগুড়ায় আমাদের দৈনিক এক হাজার টন উৎপাদনক্ষমতার একটি রাইস মিল রয়েছে। সেখানে ধানের তুষ থেকে তেল আহরণ করা হয়। তেল আহরণের পর অবশিষ্ট অংশ ডিওআরভি হিসেবে পোলট্রি ফিডে ব্যবহৃত হয়। আগে ধানের কিছু অংশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত অব্যবহৃত থাকত। বর্তমানে বিশেষ করে অটোমেটিক রাইস মিলে বিনিয়োগ বাড়ায় ধানের উপজাতের ব্যবহারও বাড়ছে। ফলে এসব উপাদান বর্জ্য হিসেবে পরিবেশে ফেলার পরিবর্তে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে।
২০১২-১৩ সালের দিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক আমাদের একটি কারখানা পরিদর্শন করে জানতে চেয়েছিলেন, এটি ইটের কারখানা কিনা। সেটি ছিল আমাদের গ্রিন ব্রিক ফ্যাক্টরি। এখানে ইট পোড়ানোর পরিবর্তে গ্রিন ইট ও ব্লক তৈরি করা হয়। আমরা নিজেরাই এগুলো তৈরি করে নিজেদের নির্মাণকাজে ব্যবহার করি এবং উৎপাদনের ২০-৩০ শতাংশ বাইরেও বিক্রি করতে পারি।
শুরুতে এ পদ্ধতিতে তৈরি প্রতিটি ইটে পোড়ানো ইটের তুলনায় ২-৩ টাকা বেশি খরচ হতো। তার পরও পরিবেশের কথা বিবেচনা করে আমরা উদ্যোগটি চালিয়ে গেছি। এখনো এ ধরনের উদ্যোগে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
রাসায়নিক শিল্পেও আমরা পরিবেশ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। রাসায়নিক উৎপাদনের উপজাত ও বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা জরুরি। এ কারণে আমাদের ব্যাকওয়ার্ড ইন্ডাস্ট্রিতে বড় অংকের মূলধনি বিনিয়োগ করতে হয়েছে। রাসায়নিক বর্জ্য বাইরে বা নদীতে না ফেলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহারযোগ্য উপজাত কাজে লাগানো হচ্ছে; এসব উপাদান থেকে তৈরি পণ্য রফতানিও করা হচ্ছে।
কস্টিক সোডা, পিভিসি, পিইটি এবং আরো বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য একসময় বাংলাদেশে মূলত আমদানি করতে হতো। এখন দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য উৎপাদন করছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানও দেশের চাহিদা পূরণে অবদান রাখছে এবং ইউরোপ ও আমেরিকাসহ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রফতানি করছে।
আমরা ২০০৪ সালে তিন মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করি। পরে সক্ষমতা বাড়িয়ে ১০ মেগাওয়াট করি। এরপর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেও বিনিয়োগ শুরু হয়।
আমাদের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উচ্চ তাপমাত্রার ধোঁয়া ও বর্জ্য তাপ কাজে লাগিয়ে স্টিম তৈরি করা হয়। সেই স্টিম সুগার মিলসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছি। অর্থাৎ একই জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ, তাপ ও স্টিম উৎপাদনের মাধ্যমে ট্রাই-জেনারেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জ্বালানির ব্যবহার আরো দক্ষ করা সম্ভব হচ্ছে।
কার্বন ক্রেডিট থেকেও আমরা কয়েক লাখ ডলার আয় করেছি। ২০১০-১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এ খাত থেকে তুলনামূলক ভালো আয় হয়েছিল, যদিও বর্তমানে তা অনেক কমে গেছে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আমরা ২০১৩-১৪ সালের দিকে কাজ শুরু করি। তখন চার-পাঁচ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে ৭-৮ কোটি টাকা ব্যয় হতো। বর্তমানে একই ধরনের সক্ষমতা স্থাপনের ব্যয় কমে প্রায় তিন-সাড়ে তিন কোটি টাকায় নেমেছে।
আমাদের কারখানাগুলোর ছাদে বর্তমানে ৬৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা চালু রয়েছে। আগামী বছর নতুন সাতটি কারখানায় আরো ৪৫ মেগাওয়াট স্থাপনের জন্য এরই মধ্যে এলসি খোলা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে এ সক্ষমতা যুক্ত হলে আমাদের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মোট সক্ষমতা ১১০ মেগাওয়াটে পৌঁছবে।
সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা আরো বাড়ানোর জন্য আমরা নতুন জায়গাও খুঁজছি। আমাদের সড়ক বিভাজকে গাছ লাগানো রয়েছে। সেখানে গাছের ক্ষতি না করে প্রায় ১৫ ফুট উচ্চতায় সৌরপ্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনা দেখেছি। ভবনের ছাদে সব ক্ষেত্রে সর্বোত্তম কোণে প্যানেল স্থাপন করা সম্ভব না হলেও সড়ক বিভাজকে উপযুক্ত কোণ পাওয়া যেতে পারে, যা উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে।
এছাড়া আমাদের প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ একর জমির চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। এর একটিতে সীমানাপ্রাচীরের পাশে গাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে সৌরপ্যানেল স্থাপনের কাজ শুরু করেছি। এ পদ্ধতিতে ব্যয় কিছুটা বেশি হলেও আমরা উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করছি। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে সেখানে আরো ২০-৩০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
আমরা শুধু বড় শিল্প-কারখানাতেই নয়, নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী ছোট পরিসরেও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের চেষ্টা করছি। আমার গ্রামের স্কুলে, বগুড়ায় এবং যশোর, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটে আমাদের বিভিন্ন বিতরণ কেন্দ্রেও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছি।
এসব উদাহরণ দেয়ার উদ্দেশ্য নিজেদের কাজের প্রচার নয়। আমি বলতে চাই, যার যেখানে যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, সেখান থেকেই উদ্যোগ শুরু করা সম্ভব। পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশেও আরো বেশি উদ্যোগ নেয়া সম্ভব। এজন্য নিজেদের পাশাপাশি সহকর্মী ও বন্ধুদেরও উৎসাহিত করতে হবে।
আমাদের যেসব ব্যাংকার ও অর্থায়নকারী দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ—সময় করে আমাদের কারখানাগুলো পরিদর্শন করুন এবং আরো ভালো করার জন্য পরামর্শ দিন। তাদের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাংলাদেশে আমরা একটি আটা-ময়দার কারখানা স্থাপন করছি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮ হাজার ২০০ টন কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। এডিবির অর্থায়নে আমরা আরো কিছু খাদ্যপণ্য উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
আমাদের আসন্ন স্টিল কারখানাটি পরিবেশের দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত অনেক স্টিল কারখানায় স্ক্র্যাপ গলানোর সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধোঁয়া ও কার্বন নিঃসরণ হয়। মেঘনা গ্রুপের নতুন স্টিল কারখানাটি বিশ্বব্যাংক ও আইএফসির অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হলেও আমরা শতভাগ গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছি।
কারখানাটির কাঁচামালের ৯০ শতাংশ আসবে স্ক্র্যাপ স্টিল থেকে। এখানে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ফার্নেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্টিল উৎপাদন করা হবে। পাশাপাশি থাকবে ফিউম ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, যাতে উৎপাদন প্রক্রিয়ার ধোঁয়া অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে।
এছাড়া ঘণ্টায় ১০ হাজার নরমাল কিউবিক মিটার সক্ষমতার অক্সিজেন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় গ্যাস উৎপাদন ব্যবস্থা, এয়ার কম্প্রেসার স্টেশন এবং আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির অন্যান্য সুবিধাও রাখা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশদূষণ কমানো।
শিল্পায়নের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণেও আমরা কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রী পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর যে উদ্যোগের কথা বলেছেন, সেটি বাস্তবায়নে নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি আগে লাগানো গাছগুলোর পরিচর্যাও নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার আবিদকে প্রথমে দুই লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য দিয়েছিলাম। তিনি জানান, একসঙ্গে এত গাছ লাগানো কঠিন; বরং ৮০ হাজার থেকে এক লাখ গাছের লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। এরই মধ্যে তিনি নতুন করে আরো ৮০ হাজার গাছ লাগিয়েছেন বলে জানতে পেরেছি।
আমাদের চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও প্রতি বছর গাছ লাগানোর নির্দেশনা দিয়েছি। নতুন সাতটি শিল্প-কারখানা, খুলনায় পরিকল্পিত শিল্প পার্ক এবং বগুড়ার স্থাপনাগুলোতেও প্রতি বছর কয়েক হাজার করে গাছ লাগানো হচ্ছে। শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেগুলোর পরিচর্যা ও টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থাও করতে হবে। এজন্য আমাদের প্রায় ৭০ জন কর্মী গাছপালার পরিচর্যায় নিয়োজিত রয়েছেন এবং ১০-১২টি গাড়ি এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সবশেষে বলতে চাই, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। আমি তাদের মতো নীতিগত বিষয়ে কথা বলার যোগ্য ব্যক্তি নই। তবে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও টেকসই উদ্যোগ বাস্তবায়নে আমাদের প্রত্যেকেরই ভূমিকা রয়েছে।
পৃথিবীকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য রাখা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ছোট উদ্যোগও একসঙ্গে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এ দায়িত্ববোধ থেকেই এমজিআই পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৃক্ষরোপণে কাজ করে যাচ্ছে। সচেতনতা, বিনিয়োগ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপের সমন্বয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য আরো সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
মোস্তফা কামাল: চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক ‘গ্রিন ডায়ালগ’-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]
