আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার আল-মাশিক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সে এ হামলা চালানো হয়।
ইয়েমেনের সরকার জানিয়েছে, হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের অন্য কর্মকর্তারা নিরাপদ ছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর দুই দেহরক্ষী নিহত হয়েছেন।
ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মোআম্মার আল-এরিয়ানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, হুথিরা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রীও হামলায় পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। হামলার পর প্রাসাদসংলগ্ন এলাকা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়।
আল-মাশিক প্রাসাদ সৌদি-সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রধান কার্যালয় ও ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানা থেকে আল-জাজিরার সংবাদদাতা ইউসুফ মাওরি বলেন, সরকারের প্রধান কার্যালয় লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা নজিরবিহীন। তাঁর মতে, এ ঘটনা দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনে সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
এডেনে হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজেও হুথি ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। হুথি গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগঠন। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ এবং এর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ উভয় পক্ষের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে।
ইয়েমেন সরকারের পক্ষের বাহিনীগুলো জানিয়েছে, তাইজ গভর্নরেটের উপকূলীয় শহর ধুবাবের বিমানবন্দরে হুথিদের হামলা প্রতিহত করা হচ্ছে। সরকারপন্থী হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, তারা সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডের সঙ্গে মিলে বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, গত ১১ দিনে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ২০ বার হামলা চালিয়েছে হুথিরা। এ ছাড়া দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও বন্দরে হামলার অভিযোগও করেছে জোটটি।
জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে বিমানবন্দরে হামলার ভিডিও প্রকাশ করেন। এতে যাত্রীদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটে যেতে দেখা যায়। জোটের দাবি, হুথিদের এসব হামলায় ১৭ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
আল-মালিকি আরও অভিযোগ করেন, হুথিরা আঞ্চলিক অন্য দেশগুলো থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করছে।
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরির মতে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সংবাদ সম্মেলনটি সামরিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কিছু ব্যর্থতার জবাব দেওয়ার প্রচেষ্টা। তাঁর ভাষ্য, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে হামলা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারলে সৌদি আরবের প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
তবে হুথিদের কর্মকাণ্ড নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিশেষ করে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলাকে নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেন এই অধ্যাপক।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০১৪ সালের শেষ দিকে সানা দখলের পর থেকে গোষ্ঠীটি সেখানে নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার দেশটির বৈধ সরকারের মর্যাদা পেয়ে আসছে। দুই পক্ষের বিরোধ ও সংঘাতের কারণে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক সংকট বিরাজ করছে।
এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলা এবং তাইজে নতুন করে সংঘর্ষের তীব্রতা ইয়েমেনের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স
