অনেক বছর পর মামুন ভাই দেশে ফিরে এসেছেন। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে কোথায় চাকরি করবেন, সেটেলড হবেন; তা না করে ভাই চলে এলেন দেশে।
আমরা তখনো অনার্স শেষ করি নাই। লাইফটা এখনো বেশ রঙিন। ছোটবেলায় মামুন ভাই আমাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। বেশির ভাগ সময়ই বল আর টেপের ব্যবস্থা তিনিই করতেন। কারণ, তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো ছিল।
আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম প্রাইমারি স্কুলের মাঠে। আমাদের দলে আমরা পাঁচজন। মামুন ভাই এসে বললেন, ‘তোরা নাকি দল বেঁধেই চলস? বিদেশে তো অনেক দিন ছিলাম। ভালো লাগল না। তোদের দলে আমাকে নিয়ে নে। আমার বন্ধুবান্ধব সব সেটেলড, দিন শেষে আবার তারা বউ-বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত। সারা দিন একা চলাফেরা ভালো লাগে না।
ওনাকে দুই দিন পরে জানাব বলে আমরা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিলাম, ওনাকে আমাদের দলে রাখা যায়। ওনাকে দলে রাখলে টাকাপয়সা নিয়ে টেনশন করতে হবে না আমাদের।
ওনার বন্ধুবান্ধব সবারই এক–দুইটা করে বাচ্চা আছে। অথচ মামুন ভাই বাইরে থাকার কারণে, বিয়েশাদি কিছুই করে নাই।
এলাকার যত সুন্দরী মেয়ে আছে তাদের খোঁজখবর নিতেন আমাদের কাছে। আমরা তেমন কিছুই মনে করতাম না। কারণ, তিনি এলাকার বাকি সবারও খোঁজ রাখতেন।
একদিন কলেজ মাঠে আমরা সবাই গেলাম কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে। মামুন ভাইয়ের খোঁজ নেই। যেই না মেয়েদের যেমন খুশি তেমন সাজে অনুষ্ঠান শুরু হলো, মামুন ভাই হঠাৎ সবাইকে ঠেলেঠুলে সামনে চলে এলেন! কলেজের এক ছেলে সেই ভিডিও আবার ছেড়ে দিছে ফেসবুকে। এলাকায় এটা নিয়ে সেই হাসাহাসি। অনেকে কমেন্ট করেছে হাসি আপাকে দেখতেই নাকি তিনি গেছেন।
আমাদের দলের একটা সুন্দর নাম আছে ‘ব্ল্যাক ড্রাগন’। এলাকার অনেক উন্নয়নকাজের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা থাকায় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে আমাদের ডাক পড়েই৷
এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং বলা হয় জাতীয় সংগীতের পরেই যেন প্রধান অতিথিদের সঙ্গে আমরা পেছনের সারিতে বসি। জাতীয় সংগীত শেষে হয়ে আমাদের নির্ধারিত স্থানে গিয়ে বসার পরও মামুন ভাইয়ের দেখা নেই। স্টেজ থেকে একটা চেয়ার সরিয়ে ফেলার পরেই মামুন ভাই স্টেজে উঠে যায় এবং বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। দর্শকসারি থেকেও হাসির রোল ওঠে।
মামুন ভাই যে মনে মনে এলাকার হাসি আপাকে পছন্দ করতেন, তা আমরা তখনো জানতামই না। হাসি আপার বিয়ের দিন আমরা সবাই গিফট নিয়ে উপস্থিত। মামুন ভাই নাই। অথচ গিফটের পুরো টাকাই উনি দিছেন।
যখন বিয়ে পড়ানোর সময় হলো তখন মামুন ভাই হঠাৎ গাড়ি নিয়ে উপস্থিত ১০–১২ জন নিয়ে৷ সবার হাতেই লাঠি। জামাই পক্ষ এবং কাজি সাহেবকে বেধড়ক মাইর দিয়ে, সেই মাইরের ভিডিও পোস্ট করে লিখলেন, ‘এলাকায় বাল্যবিবাহ রোধ কর্মসূচি চলবেই।’
এটা নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কারণ, হাসি আপার বয়স ২৪। এলাকার কাউন্সিলের নির্দেশে ‘ব্ল্যাক ড্রাগন’ দল থেকে মামুন ভাইকে বহিষ্কারের নির্দেশ শোনা যায়৷
এ নিয়ে মামুন ভাই পাল্টা পোস্ট করলেন গুজবে কান না দিতে। ‘আমি টাকা না দিলে “ব্ল্যাক ড্রাগন” এলাকায় এত কাজ করতে পারত না।’ ওই দিনই এলাকার কাউন্সিলর ২০০ চারা গাছ লাগান প্রাইমারি স্কুল ও কলেজের আশপাশে। সে আলোচনা কোথায় থাকবে মুখে মুখে, তা না। এ নিয়ে ব্ল্যাক ড্রাগনের সদস্যরাও বেশ বিব্রত। কারণ, কাউন্সিলর ব্ল্যাক ড্রাগনের অ্যাডভাইজার। আর তিনি সামনের নিবার্চনে এমপি পদপ্রার্থী হবেন বলে আশা করছেন।
ভোরেই আবার মামুন ভাইয়ের পোস্ট, আমি নিজ থেকে আজ দুপুর ১২টায় ‘ব্ল্যাক ড্রাগন’ থেকে পদত্যাগ করব।
প্রাইমারি স্কুলের মাঠে এসে দলের অন্য সদস্যদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তখন দলের প্রধান কামাল বলে উঠল, ‘আপনাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
কিছু বলার আগেই দূরে পুলিশের গাড়ি দেখা যায়। মামুন ভাই উঠেই দৌড়। কারণ, বিয়ের বাড়িতে যে ঘটনা ঘটাইছে, তার জন্য মেয়েপক্ষ মামলা ঠুকে দিয়েছে।
তিন দিন পর মামুন ভাইয়ের পোস্ট বিদেশ থেকে হলেও ‘ব্ল্যাক ড্রাগনের’ পক্ষে এলাকার কাজ করে যেতে চান। একটা হাসির ইমোজিও যুক্ত করেন পোস্টে।
