ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতার জন্য দেশটিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের সরাসরি দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অভিবাসীদের ‘হৃদয়ে থাকা ঘৃণার আগুনে’ ফ্রান্স জ্বলছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
গতকাল রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, “ফ্রান্স জ্বলছে! সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ থেকে আসা মানুষ—যাদের হৃদয়ে রয়েছে ঘৃণা—তারা একসময়ের মহান এই দেশটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই সীমান্ত বন্ধ করুন এবং পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিন!”
ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতার সূত্রপাত হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। স্কুলগুলোতে আরও শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকেরা স্বতঃস্ফূর্ত ও অহিংস আন্দোলন শুরু করেন। পরে এ আন্দোলনে যোগ দেন বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য এবং মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ, যাঁরা জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
গতকাল শনিবার উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। অন্যদিকে, দেশটির অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিজিটি ইউনিয়নের দাবি, শনিবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখ। এখন পর্যন্ত যেসব দাবির কথা জানা গেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দ্রব্যমূল্য ও সরকারি পরিষেবা—অভিবাসন নয়।
শান্তিপূর্ণ মিছিলগুলো পরবর্তী সময়ে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সরকারি ভবনে হামলার ঘটনায় রূপ নেয়। দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভের পাশাপাশি এসব সহিংস ঘটনা ঘটে।
ধ্বংসলীলা ও গণগ্রেপ্তারের রাত
রোববার ফ্রান্সজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন দেখা যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা লরেন্ট নুনেজ রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, “প্রায় এক হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন অপরাধীদের শনাক্ত করার জন্য তদন্ত চলছে, যাতে তাদের বিচারের আওতায় আনা যায়।”
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, রোববার রাতে ৮৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শহরের রাস্তায় সাইকেল, ডাস্টবিন ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডের পোড়া ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক সড়কে দেখা গেছে দোকানের ভাঙা কাচ ও পুড়ে যাওয়া গাড়ি।
প্যারিসসহ অন্যান্য শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা অসংখ্য দোকানে লুটপাট চালান। তাঁদের হামলায় প্রায় ৫০০ পুলিশ সদস্য, দমকলকর্মী ও প্যারামেডিক আহত হয়েছেন।
ফ্রান্সের এই অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য এটাই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা নিয়ে উপহাস করে বলেছিলেন, “চলুন ফ্রান্সে যাই? দারুণ একটা জায়গা। কোনো দাঙ্গা নেই, কোনো বিপ্লব নেই। অথচ দেখুন, ফ্রান্স যেন বিপ্লবের জন্য একেবারে আদর্শ জায়গা! অবিশ্বাস্য! চলুন ফ্রান্সে গিয়ে বিপ্লবে যোগ দিই।”
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে অভিবাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রোববার দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, “পাশ্চাত্যের উদারপন্থীরা বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির দোহাই দিয়ে তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশে নিয়ে এসেছে। তারা আত্মীকরণ ও সামঞ্জস্যের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে।”
ফ্রান্সের সরকারকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল উল্লেখ করে ভ্যান্স আরও বলেন, “তাদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল যে এমনটা ঘটতে পারে, কিন্তু তারা শোনেনি। আমি প্রার্থনা করি, ফ্রান্স—চমৎকার সব মানুষের এক সুন্দর দেশ—যেন আরও বেশি স্থাপনা পুড়ে ছাই হওয়ার আগেই এই পাগলামি থামিয়ে দেয়। আশা করি, মার্কিনিরা বিষয়টি খেয়াল করছেন। ডেমোক্র্যাটরা আপনাদের দেশের জন্য ঠিক এমন ভবিষ্যৎই চায়।”
ট্রাম্প এর আগেও নিজ দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন অস্থিরতা এবং সামাজিক সমস্যার সঙ্গে অভিবাসনের যোগসূত্র টেনেছেন। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ তাঁর রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি অবৈধ অভিবাসনকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং তা বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন।
এদিকে, রোববার এক বিবৃতিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, যারা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত, তাদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।
