রাজধানীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াতে মিটার থাকলেও ভাড়া নির্ধারিত হচ্ছে দর-কষাকষিতে। পছন্দের গন্তব্যে যেতে চালকদের অনীহা, মিটারে চলতে অস্বীকৃতি এবং নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি—সব মিলিয়ে অটোরিকশা সেবায় শৃঙ্খলার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। গ্যাস সরবরাহে সংকটের সময় বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু হলেও পরিস্থিতির উন্নতির পরও তা কমেনি। বরং গ্যাসের দাম বাড়ার অজুহাতে অনেক চালক একই পথে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি চাইছেন। এর সঙ্গে যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে বাড়ছে সড়কের বিশৃঙ্খলা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মের দুর্বল প্রয়োগ, নজরদারির অভাব এবং ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থায় অসংগতিই এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ। এতে যাত্রীদের বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
ভাড়া নৈরাজ্যে অতিষ্ঠ যাত্রী: রাজধানীর বনশ্রীর মেরাদিয়া থেকে গুলশান-২ যেতে আগে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা ভাড়া লাগত। এখন চালকেরা ৩৫০ টাকা পর্যন্ত চাইছেন। দর-কষাকষির পরও অনেকে ৩২০ টাকার নিচে যেতে রাজি হন না।
মেরাদিয়ার বাসিন্দা সেলিম মিয়া বলেন, ব্যবসায়িক কাজে প্রায় প্রতিদিন গুলশান-২ এলাকায় যেতে হয়। আগে ২৫০ টাকায় যাওয়া যেত, শুক্রবার সকালে রাস্তা ফাঁকা থাকলে ২০০ টাকাতেও সম্ভব হতো। এখন একই পথে ৩৫০ টাকা চাওয়া হচ্ছে।
একই এলাকার মিঠু চৌধুরী জানান, তেজগাঁও যেতে আগে ২৫০ টাকা লাগলেও এখন ৩০০ টাকা চাওয়া হয়। ফেরার পথে ইউলুপ ঘুরে আসার কথা বলে কোনো কোনো চালক ৩৫০ টাকা দাবি করেন।
রামপুরার বাসিন্দা জুয়েল বলেন, রামপুরা থেকে বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশন সদর দপ্তরে যেতে আগে ৩০০ টাকা লাগত। এখন চালকেরা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা চান। বসুন্ধরা সিটি থেকে খিলগাঁওয়ের তালতলা রুটে আগে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা লাগলেও এখন ৫০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে বলে জানান যাত্রী আশরাফুল ইসলাম। তার ভাষ্য, প্রায় ২০ দিন ধরে ৪৫০ টাকার নিচে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, বনশ্রী, রামপুরা, বাড্ডা, বসুন্ধরা, মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, মিরপুর ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি। তবে এসব রুটে ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সমন্বিত সরকারি জরিপ পাওয়া যায়নি।
গ্যাসের অজুহাতে বাড়তি ভাড়া: গ্যাস সরবরাহে সংকটের সময় রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক চাহিদামতো গ্যাস পাননি। এতে কর্মঘণ্টা কমেছে, বেড়েছে আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা।
খিলগাঁও এলাকার চালক আবু বকর বলেন, গাড়ির দৈনিক জমা প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। গ্যাস নিয়ে সারা দিন গাড়ি চালানোর পরও আয় কম হলে সংসার চালানো কঠিন। এ কারণে আগে যে পথে ২৫০ টাকা নিতেন, এখন ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা নিচ্ছেন। রামপুরার চালক আতাউরের দাবি, গ্যাসের সরবরাহ ও যানজটে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি না নিলে খরচ মেটানো কঠিন।
তবে সিএনজি ও অটোগ্যাস আলাদা জ্বালানি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করেছে। এ মূল্যবৃদ্ধিকে সিএনজির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা থাকলেও তা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করে না।
সড়কে বিশৃঙ্খলা, নজরদারির ঘাটতি: ভাড়া নিয়ে অনিয়মের পাশাপাশি যাত্রীর গন্তব্য পছন্দ না হলে যেতে না চাওয়া, মিটারে চলতে অস্বীকৃতি এবং নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে। ব্যস্ত সড়ক ও মোড়ে যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এতে সড়কের কার্যকর জায়গা কমে গিয়ে অন্য যানবাহনের গতি বাধাগ্রস্ত হয়।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিটারভাড়া কার্যকরের নির্দেশকে কেন্দ্র করে অটোরিকশাচালকদের আন্দোলন ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটে। এতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান অটোরিকশার ভাড়া নৈরাজ্যকে সড়কে সুশাসন ও শৃঙ্খলার ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার মতে, কার্যকর সুশাসন না থাকলে আইন অমান্য করে মিটার ছাড়া চলাচল এবং যাত্রীর কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩৫(৩) ধারায় নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় না করার বিধান রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) মিটারভাড়ার বেশি আদায়কারী চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঢাকা মহানগর পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু চালকদের আন্দোলন ও সড়ক অবরোধের মুখে সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয়। ঘটনাটি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনা জারির পাশাপাশি ধারাবাহিক প্রয়োগ ও তদারকির গুরুত্ব তুলে ধরে।
প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা: রাজধানীর অটোরিকশা সেবায় শৃঙ্খলা ফেরাতে মিটারভাড়া কার্যকর করা, মিটার সচল রাখা এবং নির্ধারিত ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন নিশ্চিত করা জরুরি। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও গন্তব্যে যেতে অস্বীকৃতির অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সহজে অভিযোগ জানানো ও দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ব্যস্ত সড়ক ও মোড়ে নির্ধারিত স্থানের বাইরে অটোরিকশা দাঁড়ানো বন্ধে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, দৈনিক জমা ও যানজটে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টা বিবেচনায় নিয়ে চালকদের পরিচালন ব্যয় পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
চালকদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি যাত্রীদের নির্ধারিত ভাড়ায় নির্ভরযোগ্য সেবা পাওয়ার অধিকারও রক্ষা করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নজরদারি, আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং চালক-মালিক-যাত্রীর স্বার্থের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই রাজধানীর অটোরিকশা সেবায় শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রধান শর্ত।
