সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় সৌহার্দ্য ও উৎসবের আমেজে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে যশোরের পূজামণ্ডপগুলো। দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর রাখতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, যশোর জেলা শাখা। অন্যদিকে, সীমান্তবর্তী এলাকা ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় তৎপর রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ২২২টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দুই হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্পের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করবে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স, এপিসি প্লাটুন এবং কে-৯ ডগ স্কোয়াড।
বৃহস্পতিবার বিকেলে যশোর শহরের লালদিঘীর পুকুরপাড়ে পূজা উদযাপন পরিষদের জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন সংগঠনের নেতারা।
পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এবার যশোর জেলার আটটি উপজেলায় মোট ৭২৯টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে যশোর সদরে ১৩৫টি, অভয়নগরে ১৩৩টি, মনিরামপুরে ১৩১টি, কেশবপুরে ১০২টি, বাঘারপাড়ায় ৮২টি, ঝিকরগাছায় ৬১টি, চৌগাছায় ৫৩টি এবং শার্শায় ৩২টি মন্দির ও মণ্ডপ রয়েছে।
১৫ অক্টোবর সকালে বোধন ও বিকেলে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গোৎসব। ইতোমধ্যে অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পূজাকে ঘিরে মণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
দুর্গোৎসব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে যশোর শহরের লালদিঘীর পুকুরপাড়ে পূজা উদযাপন পরিষদের জেলা কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করা হচ্ছে।
প্রতিটি মণ্ডপে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, বিকল্প আলোর ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রবীণদের সমন্বয়ে নিরাপত্তা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
উৎসব চলাকালে অপ্রীতিকর ঘটনা ও উত্তেজনা এড়াতে ক্ষতিকর ও উসকানিমূলক গান পরিবেশন থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ধর্মীয় উৎসবকে সর্বজনীন আনন্দের আয়োজনে পরিণত করতে জেলার প্রতিটি উপজেলায় হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে সম্প্রীতি শোভাযাত্রার আয়োজন করা হচ্ছে। এ উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও সংহতি প্রকাশ করছেন।
পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা বলেন, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করারও উপলক্ষ। উৎসবের আনন্দ যেন সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক রয়েছেন।
তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতায় এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপিত হবে।
এদিকে দুর্গাপূজা ঘিরে যশোরের সীমান্তবর্তী এলাকা ও শহরের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯ বিজিবি)। ব্যাটালিয়ন সূত্রে জানা গেছে, তাদের দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে ২৯টি এবং যশোর শহরে ২০টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
এসব মণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সদস্যরা দিন-রাত টহল, রেকি ও মোবাইল পেট্রোল পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, আনসার ও পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করা হচ্ছে।
বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ২২২টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দুই হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁরা ৫২টি অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প থেকে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে এপিসি প্লাটুন ও কে-৯ ডগ স্কোয়াড প্রস্তুত থাকবে।
যশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সীমান্তবর্তী বিওপিগুলোতে জনবল বাড়ানো হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা দেওয়ার জন্য ব্যাটালিয়ন সদরে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। উৎসবের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, যশোর জেলা শাখার সভাপতি দীপংকর দাস রতন, সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ, যুগ্ম সম্পাদক রতন আচার্য্য, প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত সরকার, সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি রবিন কুমার পাল, সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত সরকার, কোষাধ্যক্ষ আনন্দ সাহা এবং পৌর কমিটির সাধারণ সম্পাদক উৎপল কুমার ঘোষ উপস্থিত ছিলেন।
