নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:০৩
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও সুদৃঢ়। দক্ষিণ এশীয় দেশটিতে জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতার পরিধি বিস্তৃত, যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
ধারাবাহিকতার এই ঐতিহাসিক ধারায় এবার শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই আসন্ন সরকারি সফরে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা গতিশীল হওয়া, নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক আস্থা জোরদারের ব্যাপারে আশাবাদী টোকিও। বিশেষ করে বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং অবকাঠামো উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে জাপান।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর দেশটিতে সরকারি সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২০ অক্টোবর দুই দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরের ঘোষণা দেয়।
সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ উপলক্ষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে এক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন বলে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটাই হবে জাপানে তারেক রহমানের প্রথম সফর। ঢাকায় জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ বাসসের এক প্রশ্নের জবাবে জানায়, এই সফরের মাধ্যমে উভয় দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব নতুন মাত্রা লাভ করবে। জাপান মনে করে, আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে এই সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে জাপান দূতাবাস জানায়, নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে টোকিও।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে’ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। এছাড়া তিনি জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সুযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করবেন।
তাঁর সম্ভাব্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে— জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক।
পাশাপাশি, জাইকা (JICA), জেট্রো (JETRO), জেবিআইসি (JBIC)-এর শীর্ষ কর্তাব্যক্তি এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে।
উল্লেখ্য, জিয়া পরিবারের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক অত্যন্ত ঐতিহাসিক। ১৯৭৮ সালের এপ্রিলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাপান সফর করেন এবং ৮ এপ্রিল জাপানের সম্রাট হিরোহিতোর সঙ্গে বৈঠক করেন। ৫ থেকে ৯ দিনব্যাপী সেই ঐতিহাসিক সফরের পর, ১৯৮০ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন জাপানের প্রধানমন্ত্রী মাসায়োশি ওহিরার শেষকৃত্যে অংশ নিতেও তিনি জাপান সফর করেছিলেন। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন জাপান সফরকালেই দেশের মেগা প্রজেক্ট পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের প্রাথমিক ধারণার সূচনা হয়েছিল।
সফরের কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরের এলএনজি টার্মিনাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়া শহরের টোয়োটার একটি আধুনিক কারখানা পরিদর্শন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির উপায় নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, সফরকালে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক বিষয়ের বাইরেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখা, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত পোষণ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর দুই দেশের ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করে পারস্পরিক আস্থাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ