বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই ধমনী—ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বাবুগঞ্জের সুগন্ধা নদীর ওপর ৩৯০ মিটার দীর্ঘ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (দোয়ারিকা) সেতু এবং উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর ওপর ২৯২ মিটার দীর্ঘ মেজর এম এ জলিল (শিকারপুর) সেতুতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় বা ‘খাস কালেকশনে’ ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই দুই সেতু থেকে মোট আনুমানিক টোল আদায় হয়েছে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। কিন্তু সরকারি কোষাগারে প্রদর্শিত জমা দেখানো হয়েছে মাত্র প্রায় ৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ গায়েব বা অপ্রদর্শিত রাজস্বের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা, যার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব সরকারি নথিতে মেলেনি।
গুরুতর এই দুর্নীতি ও রাজস্ব তসরুপের অভিযোগে আলোচনার মূল কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম। তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও হস্তক্ষেপে প্রতিদিন সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ প্রকৃত টোল আয়ের বদলে নামমাত্র রাজস্ব চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হতো বলে অভিযোগ উঠেছে।
সওজ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেসার্স রহমান ট্রেডার্সকে ভ্যাট ও আয়করসহ ৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় তিন বছরের জন্য দুই সেতুর টোল ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুনে ঐতিহাসিক পদ্মা সেতু চালুর পর এই দুই সেতুতে যানবাহন চলাচল একলাফে কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং দৈনিক টোল আদায় ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ায় সওজ কর্তৃপক্ষ তিন বছরের জন্য ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে ‘চাঁদনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস’কে নতুন ইজারাদার হিসেবে প্রাথমিক অনুমোদন দেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রথম কিস্তির অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে সওজ তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করে। এরপর নতুন করে দ্রুত ইজারা চুক্তি সম্পাদন না করে সওজ সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ‘খাস কালেকশন’ বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় শুরু করে।
প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ‘খাস কালেকশন’ চলাকালে প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ টাকারও বেশি টোল আদায় করা হলেও বাস্তবে সরকারি কোষাগারে প্রতিদিন গড়ে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৯৫ কোটি টাকা আদায়ের বিপরীতে সরকারি জমার এই বিশাল ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্য কীভাবে তৈরি হলো, তা নিরপেক্ষ হিসাব নিরীক্ষা (অডিট) ছাড়া উদঘাটন করা অসম্ভব। প্রতিদিনের টোল টিকিটের কাউন্টারফয়েল, ক্যাশ রেজিস্টার, ট্রাফিক কাউন্ট ডেটা এবং ব্যাংকের জমা চালান যাচাই করলেই এই দুর্নীতির আসল সত্য উন্মোচিত হবে।
এই দুর্নীতির আরেকটি চাঞ্চল্যকর অধ্যায় উন্মোচিত হয় সওজের অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্রে। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ নবম আহ্বানে সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তিন বছরের জন্য ৮৫ কোটি টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা ‘আতিক কনস্ট্রাকশন’-কে ইজারা অনুমোদনের সুপারিশ করেন। উক্ত সুপারিশি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, খাস কালেকশন অব্যাহত রাখলে তিন বছরে সরকারের সর্বোচ্চ রাজস্ব আসতে পারে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। অথচ আতিক কনস্ট্রাকশনের ইজারা প্রস্তাবিত মূল্য ছিল ৮৫ কোটি টাকা—যা খাস কালেকশনের সম্ভাব্য হিসাবের চেয়ে ২২ কোটি টাকা বা ৩৫.৩৯% বেশি। উচ্চ রাজস্ব পাওয়ার সুনির্দিষ্ট পথ খোলা থাকা সত্ত্বেও কেন সময়মতো নতুন ইজারা কার্যকর করা হয়নি এবং বছরের পর বছর প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে খাস কালেকশনের নামে তসরুপের পথ খোলা রাখা হলো, তা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি পদে থেকে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব তসরুপ বা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা (সরকারি কর্মচারীর মাধ্যমে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ) এবং ১৯৪৭ সালের ৫(২) নম্বর দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের অধীনে মামলা দায়ের হবে। এ ধারায় অপরাধ প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কঠোর কারাদণ্ডসহ জরিমানা হতে পারে। একই সঙ্গে ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী দুদক এই অভিযোগের ওপর স্বতঃপ্রণোদিত অনুসন্ধান বা নিরপেক্ষ ফৌজদারি তদন্ত চালিয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামসহ যুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করতে পারে।
১১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এবং ২০০৩ সালে উদ্বোধন হওয়া দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের লাইফলাইন দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুর রাজস্ব এভাবে তসরুপ হওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজ। তারা অবিলম্বে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং দুদকের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্যানেল গঠন করে দায়ীদের চিহ্নিত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
