গাইবান্ধার চরে ভুট্টা চাষের মৌসুম শুরু হয়েছে। কিন্তু জমিতে দেওয়ার মতো সার পাচ্ছেন না অনেক কৃষক। কেউ দিনের পর দিন ঘুরে এক বস্তা সার জোগাড় করছেন, কেউ কিনছেন সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে। আবার কেউ সার না পেয়ে জমির একাংশে আবাদ শুরুই করতে পারেননি। অথচ সরকারি গুদামে সারের মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞাপন
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার চর গুপ্তমনিতে ভুট্টা চাষের জন্য সার কিনতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কৃষক আল আমিন। তার অভিযোগ, একেক দোকানে একেক দাম চাওয়া হয়েছে। কোথাও এক বস্তা সারের দাম চাওয়া হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা, কোথাও ১ হাজার ৪০০, আবার কোথাও ১ হাজার ৮০০ টাকা। সারাদিন ঘুরে শেষ পর্যন্ত এক বস্তা সার কিনতে পেরেছেন তিনি।
মঙ্গলবার ভুট্টা চাষের মৌসুমে সারের পরিস্থিতি দেখতে গাইবান্ধার চরে গিয়ে আল আমিনসহ যেসব কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি, তাদের প্রত্যেকেই সার পেতে ভোগান্তি ও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের উজলডাঙা গ্রামে ঘোড়ার গাড়িতে এক বস্তা সার নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন আল আমিন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে নিজেই সারের সংকটের কথা জানান। অতিরিক্ত দামের কারণে ইউরিয়া সার না কিনে তিনি ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সার কিনেছেন।
তার দাবি, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে এক বস্তা সার কিনতে হয়েছে।
চর গুপ্তমনিতে আল আমিনের ১৫ বিঘা জমি রয়েছে। এর মধ্যে এ বছর পাঁচ বিঘায় আমন ধান চাষ করেছেন। বাকি ১০ বিঘায় ভুট্টা চাষের পরিকল্পনা তার। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই সার সংগ্রহ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
একই চরের কৃষক মোহাম্মদ লিটনের জমি পাঁচ বিঘা। তাকে জমিতে ভুট্টার বীজ বুনতে দেখা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র দেড় বিঘার মতো জমিতে সার দিয়ে আবাদ শুরু করতে পেরেছেন। বাকি জমিতে সার না পাওয়ায় চাষ শুরু করতে পারেননি।
লিটন বলেন, সার পেলে আরো জমিতে ভুট্টা লাগাবেন, না পেলে পারবেন না।
তার অভিযোগ, কৃষকদের একসঙ্গে বেশি সার দেওয়া হচ্ছে না। ২০ থেকে ৩০ কেজি করে দেওয়া হচ্ছে, এর বেশি মিলছে না।
চরের প্রবীণ কৃষক আতাবর হোসেনও সারের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ডিলার ছাড়া সার পাওয়া যায় না, আবার পরিচয়পত্র ছাড়া সার দেওয়া হয় না। সার পাওয়াই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
ষাটোর্ধ্ব আতাবর হোসেন বলেন, ছয় বিঘা জমিতে আমন ধান চাষের সময়ও সার পাননি। পরে ঘোড়াঘাট থেকে ছয় বস্তা সার কিনে আনেন। স্থানীয় ডিলারের কাছে প্রতি বস্তা সারের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা চাওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ঘোড়াঘাট থেকে প্রতি বস্তা ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে সার কিনেছেন। এখন ভুট্টার জমিতে সার দিতে পারবেন কি না, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
তার দাবি, আগে কখনো সারের এমন সংকট দেখেননি।
তিন ঘণ্টার বেশি সময় চর ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে বিবিসি জানতে পেরেছে, চাহিদামতো সার না পাওয়া এবং বেশি দামে সার কেনা—এই দুই সমস্যায় পড়েছেন কৃষকেরা। তাদের অনেকে বলছেন, দীর্ঘদিন পর চাষাবাদের জন্য সার সংগ্রহ করতে এমন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
চর গুপ্তমনিতে কোথাও আমন ধান, কোথাও মরিচ চাষ হয়েছে। তবে ভুট্টা আবাদের জন্য বেশির ভাগ জমি এখনো খালি। কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, কোথাও বীজ বোনা হচ্ছে। আগাম বপন করা কিছু জমিতে ইতোমধ্যে ভুট্টার চারা গজিয়েছে।
কৃষকেরা জানান, এই চরের কয়েক হাজার বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ হয়। প্রায় সব কৃষকই এ ফসলের আবাদ করেন।
গাইবান্ধার চরে ভুট্টা প্রধান ফসলগুলোর একটি। কৃষকদের ভাষ্য, ভুট্টা চাষে প্রচুর সার লাগে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফুলছড়ি উপজেলার ৭৮টি চরে প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়। তাই মৌসুমের শুরুতেই সার না পাওয়ার আশঙ্কা তাদের মধ্যে বাড়ছে। আমন চাষের সময়ের সংকটের অভিজ্ঞতাও তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রতি বছর ৩০ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেন জাহাঙ্গির আলম। ভুট্টার জন্য ছয় বস্তা ইউরিয়া সার কিনে ফেরার পথে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরের প্রতি বস্তা ইউরিয়া তাকে ১ হাজার ৫৭০ টাকায় কিনতে হয়েছে। তবে কার কাছ থেকে সার কিনেছেন, তা প্রকাশ করতে চাননি।
জাহাঙ্গির আলম বলেন, সার চাইলে দেওয়া হয় না। বরাদ্দ নেই বলে জানানো হয়।
আরেক কৃষক জানান, ভুট্টার জন্য সার চেয়েও পাননি। তার অভিযোগ, যারা প্রভাব খাটাতে পারেন, তারা দুই বা চার বস্তা সার জোগাড় করতে পারেন। কিন্তু সাধারণ কৃষকের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না।
সার বিতরণের নিয়মে ভোগান্তি?
চলতি বছর আমন চাষের সময়ও সারের সংকটে পড়েছিলেন চরের কৃষকেরা। গাইবান্ধার পাশের কুড়িগ্রাম জেলায় ডিলারের গুদাম থেকে সার লুটের ঘটনাও ঘটে। ফুলছড়ি বাজারেও সার কেনাকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। এরপর প্রশাসন ডিলারদের কাছ থেকে সরাসরি সার বিক্রির পরিবর্তে ওয়ার্ডভিত্তিক বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সার পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
ফজলুপুর ইউনিয়নের উজলডাঙা গ্রামের সার বিক্রয় প্রতিনিধি স্বপন মিয়া জানান, তার এলাকার কৃষকদের জন্য চার দফায় মোট ৪০ বস্তা সার পেয়েছেন। প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন তিনি। বর্তমানে তার দোকানে কোনো সার নেই।
স্বপন মিয়া বলেন, সিন্ডিকেটের অভিযোগের কারণে কৃষকের কাছে ঠিকমতো সার পৌঁছানোর জন্য এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না। ডিলারের কাছে চাইলেও বরাদ্দ নেই বলে জানানো হচ্ছে। এমনকি ভুট্টা চাষের জন্য নিজেও সার পাননি তিনি।
ফজলুপুর ইউনিয়নের কৃষকদের সার সরবরাহকারী ডিলারের গুদাম ফুলছড়ি বাজারে। সেখানে কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধিকে সার সংগ্রহ করতে দেখা যায়। ডিলার মিজানুর রহমানের দাবি, সরকারের বরাদ্দ ও নীতিমালা অনুযায়ী সার বিতরণ করা হচ্ছে।
তার ভাষ্য, চলতি মাসে প্রতি ডিলারের জন্য বরাদ্দ ৪৪ টন। সেই অনুযায়ী সার ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। গত বছর একই সময়ে বরাদ্দ কিছুটা বেশি ছিল।
তবে ডিলার পয়েন্টে থাকা বিক্রয় প্রতিনিধিরা বলছেন, তারাও চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না। সার বিতরণের নীতিমালায় এক উপজেলার বরাদ্দ অন্য উপজেলায় বিক্রি এবং খোলাবাজারে সার বিক্রি নিষিদ্ধ।
বিক্রেতাদের ধারণা, এ বছর প্রশাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণেও সংকট বেড়েছে।
১৭ বছর ধরে সার বিক্রির ব্যবসা করছেন—এমন একজন প্রতিনিধি বলেন, আগে বিভিন্ন ডিলারের কাছ থেকে সার কেনা যেত। তখন এ ধরনের সংকট ছিল না। এখন নির্দিষ্ট ডিলারের কাছ থেকেই সার নিতে হচ্ছে। ফলে সবাই একই জায়গায় ভিড় করছেন এবং সংকট বাড়ছে।
নারী বিক্রয় প্রতিনিধি জেসমিনও জানান, কৃষকেরা সার চাইছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় তিনি দিতে পারছেন না। প্রতি সপ্তাহে ডিলারের কাছ থেকে যে পরিমাণ সার বরাদ্দ পান, তা কৃষকদের চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।
এএম
