নরওয়ের উয়েরা সেথের হাত ধরে ‘মায়ের তরী’র সংগঠন
লোকজ সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছে ঘরে ঘরে
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
- আপডেট সময় : ০৩:৫৯:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":[],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{"transform":1},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":true,"containsFTESticker":false}
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
বেসম দইরার পানি দেইখ্যা ভয়েতে প্রাণ বাঁচে না আগে জানলে, আগে জানলে তোর ভাঙ্গা নৌকায় চড়তাম না,ও আমার দরদী, আগে জানলে! ….
নিভৃত পল্লির আঁকা বাঁকা পথের বাঁক ঘুরতেই দুর থেকে ভেসে আসে মুর্শীদী,ভাওয়াইয়া,লালন সঙীতের সাথে দোতারা,ঢোল,হারমনিয়াম,তবলার সুরেলা আওয়াজ।নিভৃত পল্লীর “সুরেলা গুরগৃহে” প্রতিদিন ৭০/৮০ জন শিশু কিশোরীর এক সাথে গলা মিলিয়ে চলে গানের তালিম।
হাজার হাজার কিলোমিটার দুরের নরওয়ের উয়েরা সেথের প্রচেষ্টায় বাংলার হারিয়ে যাওয়া লোকজ সংস্কৃতি ফিরে পেয়েছে প্রান।ভিনদেশী উয়েরা সেথের চোখ জুড়ে স্বপ্ন বাংলার ঐতিহ্য লোকজ সংস্কৃতি তার আপন শেঁকড় থেকে বেড়ে উঠুক এবং ছড়িয়ে যাক বিশ্বব্যাপী।
এক সময় গ্রামবাংলার উঠান, নদীর পাড় আর জনপদের হাট-বাজার মুখর থাকত ভাওয়াইয়া, বাউল, লালন ও পালাগানের সুরে। আধুনিকতার প্রবল স্রোতে সেই ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত যখন নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই উত্তরাঞ্চলের শিশু-কিশোর দের মধ্যে লোকসংগীতচর্চার নতুন আলো জ্বালিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’।
লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার নিভৃত পল্লী দেওডোবা গ্রামে মায়ের তরী সংগঠন পরিচালিত ‘সুরালয় গুরুগৃহে’ বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ জন শিশু লোকসংগীত ও লোকবাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।সংগঠনটির পরিচালক ইউসুফ আলমগীর জানান, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার নয়টি গুরুগৃহে ছয় শতাধিক শিশু এ চর্চার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, লোকসংগীত চর্চার মাধ্যমে শিশুদের আত্মশুদ্ধি ও জীবনবোধের বিকাশ’ — এই ভাবনাকে সামনে রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিশুরা স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে।
লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিপ্রেমী হামিদুর রহমান হামিদ বলেন, চর্চার অভাবে গ্রামবাংলার অনেক লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্র হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশু-কিশোরদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব গান, সুর ও বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন নরওয়ের নাগরিক উয়েরা সেথ, যিনি বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি ও উত্তরাঞ্চলের ভাওয়াইয়া সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর স্বপ্ন ও পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন আজ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় লোকসংগীতচর্চায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।
বর্তমানে ‘মায়ের তরী’র প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে শতাধিক শিশু ও কিশোর-কিশোরী। হাতে একতারা, দোতারা ও বাঁশি নিয়ে তারা শিখছে ভাওয়াইয়া, লালন, বাউলসহ বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকগান। নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শুধু গান শেখানোই নয়, তাদের মধ্যে গড়ে তোলা হচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা।
সংগঠনের প্রশিক্ষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে শিশুদের একটি বড় অংশ দেশীয় সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় লোকজ সংগীতচর্চার এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে পরিচিত করছে এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অভিভাবকরাও এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, সংগীতচর্চা শিশুদের মানসিক বিকাশ,আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করছে। পাশাপাশি তারা নিজেদের এলাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছে।
‘মায়ের তরী’র নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত কার্যক্রম পরিদর্শনে আসছেন। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও বর্তমানে নয়টি গুরুগৃহে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের প্রশিক্ষণ দেওয়া অধিকাংশ গুরু প্রায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি প্রবীণ লোকসংস্কৃতিসেবীদের সম্মান ও নিরাপত্তার জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা এবং লোকসংস্কৃতি গবেষণার জন্য একটি কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি আধুনিক স্টুডিও স্থাপন করা গেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রবীণ লোকশিল্পী ও শিশু শিল্পীদের গান ও পরিবেশনা অডিও- ভিডিও ধারণ করে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এভাবে ভবিষ্যতে একটি ডিজিটাল আর্কাইভও গড়ে তোলা যেতে পারে।
জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের এ প্রশিক্ষণ স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। সরকারি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গে উদ্যোগটি সমন্বয়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।
‘মায়ের তরী’র সংশ্লিষ্টরা জানান, সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা নরওয়ের কবি, লোকগবেষক ও আলোকচিত্রী উয়েরা সেথে ১৯৯৮ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসেন। কুড়িগ্রামের রৌমারীর দক্ষিণ নামাজের চর এলাকায় বন্যা-পরবর্তী মানুষের জীবন দেখতে গিয়ে চরের নারীদের কণ্ঠে মারফতি ও মুর্শিদি গান শুনে তিনি এ সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠকদের নিয়ে ২০১৬ সালে ‘মায়ের তরী’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রতি উয়েরা সেথের আগ্রহের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে বই প্রকাশ করা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্য, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাবের মধ্যেও প্রায় এক দশক ধরে সংগঠনটির কার্যক্রম চলছে। প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে একতারা, দোতারা ও বাঁশির প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি লোকগানের চর্চা করানো হচ্ছে।
তাদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা পাওয়া গেলে উত্তরাঞ্চলের লোকসংগীত, লোকবাদ্যযন্ত্র ও লোকঐতিহ্য সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
