পাকিস্তানের টি-টুয়েন্টি ব্যাটিংয়ে আগ্রাসনের অভাব নতুন কিছু নয়। বড় ইনিংস খেললেও পাওয়ার প্লেতে ধীরগতির ব্যাটিং, শুরুতে অতিরিক্ত সতর্কতা আর রান তোলার সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার পুরোনো সমস্যা বারবার ভুগিয়েছে দলটিকে।
সে কারণে বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের মতো নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানও দল থেকে বাদ পড়েছেন। এ সমস্যার সমাধান হতে পারেন পাকিস্তানের তরুণ ক্রিকেটার মাজ সাদাকাত।
কেন আলোচনায় মাজ সাদাকাত
টি-টুয়েন্টিতে অন্তত এক হাজার রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে মাত্র ২২ জনের ব্যাটিং গড় ৩০-এর বেশি এবং স্ট্রাইক রেট ১৫০-এর বেশি। এই তালিকায় পাকিস্তানের একমাত্র ব্যাটসম্যান সাদাকাত।
মানে আধুনিক টি-টুয়েন্টি ব্যাটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দুটি গুণ—নিয়মিত রান করা এবং দ্রুত রান তোলা—তাঁর আছে। যদিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর অভিজ্ঞতা এখনো সীমিত।
গত মাসে এশিয়ান গেমসে টি-টুয়েন্টি অভিষেকের পর পাকিস্তানের হয়ে এ পর্যন্ত পাঁচটি আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি খেলেন সাদাকাত। কিন্তু এই অল্প সময়েই নিজের সামর্থ্যের ঝলক দেখিয়েছেন। এ ছাড়া ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও তাঁর পারফরম্যান্স পাকিস্তানের আশা বাড়াচ্ছে।
৮ ইনিংসে ৪৫১ রান, স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৯৫
গত এক মাসে সাদাকাতের পারফরম্যান্স অনেকটা স্বপ্নের মতো। এ সময়ে ৮ ইনিংসে ৪৫১ রান করেছেন, স্ট্রাইক রেট ১৯৪.৩৯।

সর্বশেষ সিপিএলে জ্যামাইকা কিংসম্যানের হয়ে দুটি সেঞ্চুরি করেন সাদাকাত। সেটিও এসেছে এলিমিনেটর ও ফাইনালে। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজে প্রথম দুই টি-টুয়েন্টিতে পাকিস্তানের হয়ে করেন দুটি ফিফটি। একটি ছিল ৯৬ রানের ইনিংস।
ওপেনারদের জন্যও বড় ভরসা
এমনিতে সাদাকাত ওপেনার। তবে সর্বশেষ সিরিজে খেলেছেন তিন নম্বরে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওপেন করেছেন সাহিবজাদা ফারহান ও ফখর জামান। আপাতত তাই তাঁকে তিনেই খেলতে হবে।
অন্তত ৪৫০ রান করা জুটিগুলোর মধ্যে ফখর জামান ও সাহিবজাদা ফারহানের চেয়ে দ্রুত রান তোলা পাকিস্তানের আর কোনো ওপেনিং জুটি নেই। দুজনেরই শুরুতে ধীরগতির হয়ে পড়ার প্রবণতা আছে। ৭-৮ বল দেখে এরপর আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে পাওয়ার প্লের প্রথমার্ধে রানের গতি কমে যায়।সাদাকাত ৩ নম্বরে খেললে সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে পাকিস্তান।
ওপেনাররা শুরুতে বেশি ডট বল খেললেও তিনি দ্রুত রান তুলে স্কোরবোর্ড সচল রাখতে পারেন। আবার ওপেনাররা ভালো শুরু এনে দিলে সেই গতিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্যও তাঁর রয়েছে। এ কারণেই পাকিস্তানের টপ অর্ডারে সাদাকাতের উপস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বিষয় নয়। এটি পুরো ব্যাটিং ইউনিটের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে পারে।
পেস ও স্পিন-দুই ধরনের বোলিংয়েই কার্যকর
৩ নম্বরে ব্যাট করতে নামা একজন খেলোয়াড়ের সামনে আলাদা চ্যালেঞ্জ থাকে। পাওয়ার প্লের সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি মাঝের ওভারগুলোতেও রান তোলার গতি ধরে রাখতে হয়। কখনো উইকেট পড়লে ইনিংস সামলাতে হয়, আবার কখনো আক্রমণ চালিয়ে যেতে হয়। স্পিন-পেস দুই বিভাগকেই সামলানোর কৌশল জানতে হয়।

সাদাকাতের পরিসংখ্যান বলছে, পেস ও স্পিন-দুই ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষেই তিনি কার্যকর। সব ধরনের টি-টুয়েন্টিতে পেস বোলারদের বিপক্ষে তাঁর ব্যাটিং গড় ৩৭.২১ এবং প্রতি ওভারে রান তোলার হার ১০.৩৯। স্পিনারদের বিপক্ষে ব্যাটিং গড় ৩৭.৫৮ এবং প্রতি ওভারে রান তোলার হার ৯.৪৪। এই ভারসাম্য তাঁকে ৩ নম্বর পজিশনের জন্য আরও উপযুক্ত করে তুলেছে।
মাঠের সব দিকেই শট খেলার সামর্থ্য
সাদাকাতের ব্যাটিংয়ের আরেকটি বড় শক্তি হলো মাঠে সব দিকে শট খেলার সামর্থ্য। শুধু সোজা ব্যাটে কিংবা মিড উইকেটের ওপর দিয়ে বড় শট খেলেই রান করেন না, অফ সাইডেও তাঁর শটে বৈচিত্র্য রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৯৬ রানের ইনিংসে সামনের পা ও পেছনের পায়ে ভর করে পয়েন্টের সামনে ও পেছনে দারুণ কিছু শট খেলেন। রোববারের সেই ইনিংসে দাসুন শানাকার করা অফ স্টাম্পের বাইরের লেংথ বলকে রিভার্স প্যাডল করে উইকেটকিপার ও শর্ট থার্ডম্যানের মাঝের ফাঁক দিয়ে সীমানায় পাঠান সাদাকাত। পরে নুয়ান তুষারাকে শর্ট ফাইন লেগের ওপর দিয়ে র্যাম্প শটও খেলেন।
The no-look shot: Maaz Sadaqat edition
— Pakistan Cricket (@TheRealPCB) October 9, 2026
Nonchalantly sends it sailing over the ropes #PAKvSL | #CricketKaJashan | #BackTheBoysInGreen pic.twitter.com/hofvSlFHGI
অবশেষে সমাধান?
২০২৫ সালের শুরু থেকে পাকিস্তান টি-টুয়েন্টিতে ৩ নম্বর পজিশনে ৪৮ ম্যাচে ১০ জন ব্যাটসম্যানকে খেলিয়েছে। কিন্তু এখনো এই জায়গায় স্থায়ী কাউকে খুঁজে পায়নি দলটি।
সাদাকাতের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সেই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান সামনে এনেছে। তাঁর ব্যাটিংয়ে আগ্রাসন আছে, পেস ও স্পিনের বিপক্ষে কার্যকারিতা আছে, মাঠের বিভিন্ন দিকে শট খেলার সামর্থ্যও আছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি অনুযায়ী ইনিংসের গতি বদলানোর ক্ষমতাও দেখিয়েছেন এই বাঁহাতি।
তবে মাত্র পাঁচটি আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি খেলে কাউকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে ঘোষণা দেওয়া তাড়াহুড়া হবে। তাঁকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। প্রতিপক্ষের বোলাররা তাঁর ব্যাটিং বিশ্লেষণ করে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আসবে। সেই চ্যালেঞ্জ সামলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলেই ৩ নম্বর পজিশনে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করতে পারবেন সাদাকাত।
