নদীর ওপর নেই স্থায়ী সেতু। কাঠের সাঁকোই তিন ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। দীর্ঘদিন ব্যবহারে সাঁকোটির পাটাতনের তক্তা বেঁকে গেছে, নড়বড়ে হয়ে গেছে নিচের পিলার। দুই পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় প্রতিটি পদক্ষেপেই রয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
বিকল্প পথ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নদী পারাপার হতে হচ্ছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা, গয়াবাড়ী ও খালিশা চাপানী ইউনিয়নের মানুষকে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও কর্মজীবীরা। অসুস্থ রোগীদেরও ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে এলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গাছবাড়ি এলাকায় নাউতারা নদীর ওপর সাঁকোটির অবস্থান। স্থানীয় উদ্যোগে নির্মিত এ সাঁকো তিন ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এর বিভিন্ন অংশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। পাটাতনের তক্তা বেঁকে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে ফাঁক ও গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। দুই পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় সামান্য অসতর্কতায় নদীতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই সাঁকো দিয়ে চলাচল করেন। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বেড়ে গেলে পারাপারের ঝুঁকি আরও বাড়ে। জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া কিংবা দৈনন্দিন কাজে হাটবাজারে যাতায়াত করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাঁদের। স্থায়ী সেতু না থাকায় নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সাঁকোটি ব্যবহার করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে থাকেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। ঐতিহ্যবাহী ছোটখাতা কামিল মাদ্রাসাসহ একাধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এ পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ পাটাতন ও নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাবে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন অভিভাবকেরা। তাদের আশঙ্কা, কোনো শিক্ষার্থী ভারসাম্য হারিয়ে নদীতে পড়ে গেলে দ্রুত উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, নাউতারা নদীর ওপর সেতু না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। সাঁকোটির অবস্থা ভালো নয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে পারাপারের ভয় আরও বেড়ে যায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছি।
স্থানীয় বাসিন্দা হাছেন আলী বলেন, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অসুস্থ রোগী, সবাইকে এই সাঁকো দিয়ে নদী পার হতে হয়। সন্তানদের স্কুল-মাদ্রাসায় পাঠিয়ে অভিভাবকেরা দুশ্চিন্তায় থাকেন। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই এখানে সেতু নির্মাণ করা জরুরি।
সেতুর অভাবে ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষকেরাও। তিন ইউনিয়নের অনেক কৃষক ধান, ভুট্টা, পাট ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য গাছবাড়ি, নাউতারা হাট, নতুন বাজার ও শুটিবাড়ি হাটে নিয়ে যেতে এ পথ ব্যবহার করেন। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোর কারণে কৃষিপণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় ও খরচের মুখে পড়তে হয় তাদের। এতে কৃষিকাজ ও পণ্য বাজারজাতকরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ বলেন, এ পথে তিন ইউনিয়নের মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে চলাচল করেন। কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজেও সাঁকোটি ব্যবহার করতে হয়। স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে, যোগাযোগব্যবস্থাও সহজ হবে।
নাউতারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আশিক ইমতিয়াজ মোর্শেদ বলেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আঞ্চলিক যোগাযোগপথ। আমার উদ্যোগে নির্মিত সাঁকোটি এখন প্রায় অচল। এখানে বহু আগেই একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হওয়া উচিত ছিল।
ডিমলা উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান বলেন, স্থানটি পরিদর্শন করেছি। এখানে জরুরি ভিত্তিতে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ প্রয়োজন। বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, সেতুটির গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা চলছে।
