সেমিস্টার ফাইনাল, ল্যাব, কুইজ ও ভাইভার চাপ সামলে টিউশনের আয় আর হাতখরচের টাকা জমিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছেন একদল তরুণ শিক্ষার্থী। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুই বছরের বেশি সময়ের পরিশ্রমে তৈরি তাদের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘অন্যপাতা’ মুক্তি পেয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, সংগ্রাম, প্রেম ও মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েন নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি প্রথম ধাপে দেশের ১০টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে।
এসজেএ প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত সিনেমাটির গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছেন পরিচালক মো. শাহজাহান এ্যানি। তিনি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী। সিনেমাটির পেছনে নেই কোনো বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বা বিনিয়োগকারী। নির্মাতারা নিজেদের অর্থায়নেই পুরো কাজ সম্পন্ন করেছেন।
ছয়জনের উদ্যোগ এখন ৪০ জনের দল
সিনেমা নির্মাণের শখ থেকে ছয়জনের হাত ধরে শুরু হয়েছিল ‘অন্যপাতা’র যাত্রা। পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে যুক্ত হন। অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, শিল্প নির্দেশনা, সংগীতসহ বিভিন্ন দায়িত্ব ভাগ করে নেন তারা। বর্তমানে দলটির সদস্যসংখ্যা ৪০ জনের বেশি।
পরিচালক শাহজাহান এ্যানি জানান, কোভিডের সময় প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তার পরিচালনার যাত্রা শুরু হয়। এরপর চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা ও প্রস্তুতির সময় পার করে ‘অন্যপাতা’ নির্মাণে হাত দেন তিনি। নির্মাণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এ্যানি বলেন, ‘ছয়জনের একটি দল থেকে ধীরে ধীরে আমাদের টিম ৪০ জনে পরিণত হয়েছে। তাই মাঝে মাঝে আমরা বলি, অন্যপাতা আমরা তৈরি করিনি, অন্যপাতাই আমাদের তৈরি করেছে।’
ভর্তি পরীক্ষার চেনা লড়াই
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে কোচিং, ব্যাচ ও মডেল টেস্টের প্রতিযোগিতায় নামতে হয় অসংখ্য শিক্ষার্থীকে। কিন্তু সবার সামর্থ্য এক নয়। ‘অন্যপাতা’র গল্পে উঠে এসেছে এমনই এক মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণের জীবন, যার কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার সামর্থ্য নেই, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন প্রবল।
পরিবারের প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক সংকট, ভালোবাসা ও পরিচয়ের সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় গল্পটি। পরিচালক এ্যানির ভাষ্য, এটি কোনো পরীক্ষামূলক গল্প নয়; বরং তরুণদের পরিচিত জীবনসংগ্রামের প্রতিফলন। তার প্রত্যাশা, দর্শক বড় পর্দায় নিজেদের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে গল্পটির মিল খুঁজে পাবেন। সিনেমাটির অন্যতম প্রযোজক অংকন দে অনিমেষ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রায় সবাইকে যেতে হয়, অথচ এ সময়কে ঘিরে কাজ তুলনামূলক কম হয়েছে। সেই জায়গা থেকেই গল্পটি পর্দায় আনার প্রয়োজন অনুভব করেছেন তারা। তার আশা, গল্পের পাশাপাশি সিনেমার গান, আবহসংগীত ও নির্মাণশৈলী দর্শকদের ভালো লাগবে।
নির্মাণের পর বড় চ্যালেঞ্জ মুক্তি
নিজেদের অর্থায়নে সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি সেটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার কাজও সামলাতে হয়েছে তরুণদের। চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিতরণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। নির্মাতাদের ভাষ্য, বিভিন্ন জটিলতার পাশাপাশি প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় এক লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়েছিলেন তারা। তবে এসব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। প্রযোজক অংকন দে অনিমেষ জানান, শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা না থাকা সদস্যদের নিয়ে কাজ শুরু করলেও দলের আন্তরিকতা ও পরিশ্রমে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। সিনেমা মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও প্রক্রিয়া সামলানোই তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
অভিনয় ও সংগীতে তরুণদের অংশগ্রহণ
‘অন্যপাতা’র প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়া শাকিল ও প্রত্যাশা পাল। দুজনেরই কাছে এটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। শাকিলের মতে, দুই বছরের বেশি সময় ধরে একটি চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখার অভিজ্ঞতা ছিল নতুন ও অনুপ্রেরণাদায়ক। অন্যদিকে প্রত্যাশা জানিয়েছেন, গল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি অভিনয়ে আগ্রহী হয়েছেন। প্রায় ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের সিনেমাটিতে রয়েছে ছয়টি মৌলিক গান ও আবহসংগীত। সংগীত পরিচালনা করেছেন ফাহরিয়াজ তাসজিম মনন, আর আবহসংগীত তৈরি করেছেন আইনান। চিত্রগ্রহণে ছিলেন ইব্রাহিম বিন আনছারী এবং শিল্প নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন ইন্দ্র নীল। সিনেমাটির দৃশ্যায়নে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরা হয়েছে।
১০ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি
নির্মাতাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ‘অন্যপাতা’ মুক্তি পেয়েছে ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সের সনি স্কয়ার শাখা, শ্যামলী সিনেমা, কেরানীগঞ্জের লায়ন সিনেমাস, চট্টগ্রামের স্টার সিনেপ্লেক্সের বালি আর্কেড শাখা ও সুগন্ধা সিনেপ্লেক্স, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের কে স্ক্রিন, রাজশাহীর গ্র্যান্ড রিভার ভিউ, বগুড়ার মমো ইন সিনেপ্লেক্স, নারায়ণগঞ্জের সিনেস্কোপ এবং কুষ্টিয়ার স্বপ্নীল সিনেপ্লেক্সে। দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেলে পরবর্তী সময়ে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে নির্মাতাদের। নিজেদের স্বপ্ন ও পরিশ্রমে তৈরি সিনেমাটি দর্শকের কাছে কতটা সাড়া ফেলে, এখন সেই অপেক্ষায় তরুণ নির্মাতা দল।
