“আপনার পছন্দ হোক বা না-ই হোক, জীবন আপনাকে সব রকমের সার্কাস, জাগলিং আর কসরত করাবে। যদি প্রস্তুত থাকেন, তাহলে এই সবকিছুই আপনি সানন্দে করতে পারবেন।” — সদগুরু
জীবন কখনো মঞ্চ, কখনো দড়ির ওপর হাঁটা, কখনো একসঙ্গে অনেকগুলো বল শূন্যে ছুড়ে দিয়ে সেগুলো মাটিতে পড়ার আগেই সামলে নেওয়ার নাম। আমরা চাই বা না চাই, জীবন তার নিজস্ব খেলা খেলবেই। সেখানে পরিবার, সম্পর্ক, দায়িত্ব, জীবিকা, স্বপ্ন, প্রাপ্তি, বিচ্ছেদ আর অপ্রাপ্তি মিলেমিশে তৈরি করে বিচিত্র এক সার্কাস।
কখনো এক হাতে সামলাতে হয় সংসার, অন্য হাতে নিজের স্বপ্ন। কখনো মুখে হাসি রেখে বুকের ভেতর বয়ে বেড়াতে হয় এক সমুদ্র বিষাদ। কখনো যাদের জন্য পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করি, তারাই আমাদের লড়াইয়ের ভাষা বুঝতে পারে না। আবার কখনো সম্পূর্ণ অচেনা কোনো মানুষ বাড়িয়ে দেন এমন এক হাত, যা দীর্ঘদিনের ক্লান্তিকে মুহূর্তে হালকা করে দেয়।
জীবনের সবচেয়ে বড় কসরত অন্যকে হারানো নয়, নিজের ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলা।
আমরা প্রায়ই ভাবি, সবকিছু আমাদের পরিকল্পনামতো চললেই বুঝি জীবন সুন্দর হবে। অথচ জীবনের সৌন্দর্য সব সময় অনুকূল পরিস্থিতিতে লুকিয়ে থাকে না। অনেক সময় তা ধরা দেয় প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার ক্ষমতায়।
যে মানুষ ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে জানেন, হারানোর মধ্যেও নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন না, আর সাফল্যের উল্লাসেও নিজের মানবিকতা বিসর্জন দেন না, তিনিই জীবনের খেলায় প্রকৃত দক্ষতা অর্জন করেন।
প্রস্তুত থাকা মানে এই নয় যে আমাদের কোনো ভয় থাকবে না, মন খারাপ হবে না, কিংবা কোনো আঘাত আমাদের দুর্বল করবে না। প্রস্তুত থাকা মানে, আঘাতের পরেও নিজেকে ফিরে পাওয়ার পথটুকু চিনে রাখা।
মানে, সব বল একসঙ্গে শূন্যে ধরে রাখতে না পারলেও নিজেকে ব্যর্থ ঘোষণা না করা। কিছু বল মাটিতে পড়বেই, কিছু পরিকল্পনা ভেঙে যাবেই, কিছু মানুষ চলেও যাবেন। তবু জীবন থেমে থাকে না।
এখানেই প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা, আত্মোপলব্ধি আর গ্রহণ করার সাহস। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু প্রতিকূলতার মুখে আমাদের প্রতিক্রিয়াটি অনেকাংশেই আমাদের হাতে। পরিস্থিতি সব সময় পছন্দমতো হবে না তবু সেই পরিস্থিতির মধ্যে আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠব, সেই সিদ্ধান্তের মধ্যেই আমাদের ব্যক্তিত্বের পরিচয়।
আর হ্যাঁ, জীবনের সার্কাসে দর্শক হওয়ার সুযোগ খুব কম। এখানে প্রত্যেককেই কোনো না কোনো সময়ে মঞ্চে উঠতে হয়। কেউ আলোয় দাঁড়িয়ে নিজের কসরত দেখান, কেউ পর্দার আড়ালে নীরবে সামলান অসংখ্য দায়িত্ব।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, অন্যের নিখুঁত প্রদর্শনী দেখে নিজের জীবনের অসম্পূর্ণতাকে ছোট করে দেখার কোনো অর্থ নেই। আমরা প্রত্যেকে ভিন্ন মঞ্চে, ভিন্ন বাস্তবতায়, ভিন্ন সামর্থ্য নিয়ে লড়ছি।
তাই নিজের গতিতে হাঁটুন। প্রয়োজন হলে থামুন, বিশ্রাম নিন, আবার শুরু করুন। সব পরিস্থিতিতে হাসতেই হবে, সব কষ্টকে ইতিবাচকতার মোড়কে ঢাকতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কখনো চোখের জলও আমাদের ভেতরের ভার হালকা করে, কখনো নীরবতাও নতুন করে বাঁচার শক্তি জোগায়।
জীবনকে ভালোবাসা মানে জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতি পছন্দ করা নয়; বরং অপছন্দের বাস্তবতার মধ্যেও বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে নেওয়া। জীবন যখন সার্কাসের মঞ্চে দাঁড় করাবেই, তখন শুধু কসরত শেখা কেন, আনন্দ খুঁজে নেওয়ার শিল্পটাও শিখি। কারণ দিন শেষে নিখুঁত প্রদর্শনীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতটা সততা, মমতা ও সাহস নিয়ে আমরা নিজেদের জীবনটুকু যাপন করলাম।
তুমি রহো আমার অন্তরে, তুমি রহো প্রাণে,
জীবনের প্রতিটি খেলায় দাও প্রজ্ঞার সন্ধানে।
জীবনকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে সচেতনতা, ধৈর্য আর প্রস্তুতি নিয়ে তার অনিশ্চয়তার ভেতরেও খুঁজে নেওয়া যায় আনন্দ, অর্থ ও মুক্তির স্বাদ।
জীবনের প্রতিটি কসরতে ভারসাম্য থাকুক, প্রতিটি পতনের পর ফিরে দাঁড়ানোর সাহস থাকুক, আর প্রতিটি নতুন দিনে বেঁচে থাকার আনন্দটুকু অটুট থাকুক।
লেখক : নাজমীন মর্তুজা, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কবি, গীতিকার, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
