বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার।
তার মতে, শুধু কম উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়; বরং পরিবেশগত টেকসই উৎপাদন, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে উৎপাদনে অধিক মূল্য সংযোজন, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মনোযোগ দিতে হবে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্যে তিনি এসব অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন।
বিজ্ঞাপন
ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি
ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে সুবিধাজনক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩.৩ শতাংশ কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেলেও বাংলাদেশের জন্য শুধু কম উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতা করা যথেষ্ট হবে না।
তার মতে, টেকসই উৎপাদন, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পরিপালন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ও বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
বিজ্ঞাপন
নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর দ্বিতীয় অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পরামর্শ দিয়েছেন মোলার।
তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং দক্ষতার সঙ্গে জ্বালানি ব্যবহার ব্যয়বহুল আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা চালু করলে কারখানাগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত (ইএসজি) শর্ত এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়তা পাবে।
বিজ্ঞাপন
তার মতে, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জনেরও একটি উপায়।
পণ্য ও রপ্তানি বাজারে বহুমুখীকরণ
তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে পণ্য ও রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের কথা বলেন ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত। তিনি মনে করেন, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও রপ্তানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান পণ্যে মূল্য সংযোজন বাড়িয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে যেতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করতে সীমিতসংখ্যক পণ্য ও বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন বা নির্দিষ্ট কোনো খাতের সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
এ ক্ষেত্রে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বিদ্যমান শক্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ খাতে পশ্চাৎমুখী সংযোগশিল্পের শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে এবং প্রায় ৬০ শতাংশ মূল্য সংযোজন সম্ভব হচ্ছে। এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি মূল্য সংযোজন, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও কর্মসংস্থান
চতুর্থ অগ্রাধিকার হিসেবে সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের পথে এগিয়ে নিতে কার্যকর সংস্কার জরুরি।
তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক মূল্যায়নের উল্লেখ করে বলেন, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩.৫ শতাংশ হতে পারে। আর কার্যকর সংস্কার না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব পূর্বাভাস অর্থনৈতিক সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে তরুণ ও নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শ্রমবাজারে ন্যূনতম মানদণ্ড কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, মজুরি নির্ধারণব্যবস্থায় আরও নমনীয়তা আনার পাশাপাশি ন্যূনতম শ্রমমান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে বিভাজন তৈরির সুযোগ কমবে এবং শ্রমিকদের আয় ও স্থানীয় ভোগ বাড়বে। পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা ভারসাম্যপূর্ণ করা এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। বর্ধিত রাজস্ব স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে এবং উৎপাদনশীলতা উন্নত করতে সহায়তা করবে বলে মনে করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও বিনিয়োগের পরিবেশ
পঞ্চম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেন ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত। তার মতে, বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতা, পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং কার্যকর রাষ্ট্র ও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা জরুরি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও যেন এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের অংশীদার মনে করতে পারে, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এমন দেশে বিনিয়োগ করতে তুলনামূলকভাবে বেশি দ্বিধা বোধ করেন, যেখানে দেশীয় বিনিয়োগ কম এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর। এসময় তিনি দুর্বল সরকারের পরিবর্তে ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, জ্বালানিসংকটসহ বাংলাদেশের সামনে অনেক তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না।
টেকসই উন্নয়নে অংশীদারত্ব
মোলার তার বক্তব্যে বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের বিষয়টিও তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশি শিল্পের সঙ্গে ডেনমার্কের সহযোগিতা শুধু সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং যৌথভাবে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথ তৈরি করাই এর লক্ষ্য।
এ ক্ষেত্রে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের উদাহরণ দেন তিনি। প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) প্রকল্পে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস, এপিএম মার্স্ক এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ যুক্ত রয়েছে। তার মতে, নতুন টার্মিনালটি শুধু একটি খাত নয়, বরং দেশের বিভিন্ন শিল্পের জন্য সহায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়নে পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত তথ্যের ড্যাশবোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সহায়ক হবে।
আইএইচও/এমআইএইচএস/
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
