নরসিংদী দেশের প্রাচুর্যময় ইতিহাস ও ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি সমৃদ্ধ এক জেলা। উয়ারী-বটেশ্বরের প্রাচীন মানববসতি থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় এবং মোগল আমলের অসংখ্য নিদর্শনের সাক্ষী এ অঞ্চল। জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্যগুলোর মধ্যে ধর্মীয় ও নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম শিবপুর উপজেলার আশরাফপুর তিন গম্বুজ মসজিদ। মোগল স্থাপত্যশৈলী ও মধ্যযুগীয় কারুকার্যের সমাহার নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে এ মসজিদ।
আশরাফপুর মসজিদটি নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার আশরাফপুর গ্রামে অবস্থিত। আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে, অর্থাৎ মোগল আমলে এটি নির্মিত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, সুবেদার শায়েস্তা খানের আমলে বা তার সমসাময়িক সময়ে বাংলায় যে একক ও তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের বিস্তার ঘটেছিল, এটি তারই একটি নিদর্শন।
এ মসজিদের সঙ্গে বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত শাহ কাইনাত (র.)-এর স্মৃতি গভীরভাবে জড়িত। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আগমনকারী সাধকদের প্রার্থনার সুবিধার্থে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সুসংগঠিত করতে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
আশরাফপুর মসজিদের মূল আকর্ষণ এর স্থাপত্যরীতির নিজস্বতা। মোগল স্থাপত্যের ঐতিহ্যবাহী উপাদানগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় নির্মাণশৈলীর ছোঁয়া এতে সুস্পষ্ট।
মসজিদের ছাদে সুবিন্যস্তভাবে তিনটি গম্বুজ রয়েছে। মাঝের গম্বুজটি আকারে পাশের দুটি থেকে সামান্য বড়, যা ঐতিহ্যবাহী মোগল রীতির অন্যতম লক্ষণ বলে স্থানীয়রা জানান। চার কোনায় রয়েছে চারটি মজবুত অষ্টকোণাকৃতির মিনার। এটি মসজিদের ছাদ পার হয়ে ওপরে উঠে গেছে।
মসজিদের পূর্ব দেয়ালে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার রয়েছে। এর মধ্যে মাঝের প্রবেশদ্বারটি অপেক্ষাকৃত বড়। ভেতরের পশ্চিম দেয়ালে প্রবেশদ্বারের মুখোমুখি তিনটি সুন্দর মেহরাব রয়েছে। মাঝের মেহরাবটি সূক্ষ্ম পোড়ামাটির নকশা ও লতাপাতার কারুকাজে সজ্জিত।
এটি তৈরিতে মূলত লাল ইট, চুন ও সুরকি ব্যবহার করা হয়েছে। দেয়ালগুলো বেশ পুরু, যা শত শত বছর ধরে তীব্র আবহাওয়া ও ভূমিকম্প সহ্য করে অবকাঠামোকে টিকিয়ে রেখেছে।
আশরাফপুর এলাকাটি প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ মসজিদের আশপাশ থেকেই ১৯শ শতাব্দীর শেষের দিকে সপ্তম শতাব্দীর রাজা দেবখড়গের ঐতিহাসিক তামা শাসন আবিষ্কৃত হয়েছিল, যা বাংলার প্রাচীন ইতিহাস পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে প্রাচীন এ মসজিদের কিছু অংশ সংস্কার করা হলেও এর মূল কাঠামো এবং প্রাচীন আবেদন এখনো বজায় রয়েছে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের তত্ত্বাবধানে এটি সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমী এ প্রাচীন স্থাপত্য দেখতে এবং নামাজ পড়তে এখানে আসেন।
