দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো তীব্র শিক্ষকসংকটে ভুগছে। বর্তমানে এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের প্রায় ৩৮ শতাংশ পদ শূন্য এবং ৬৬ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। এর পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিখনদক্ষতা অর্জন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে খণ্ডকালীন বা অতিথি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কোনো রকমে পাঠদান কার্যক্রম সচল রাখছে।
দীর্ঘ ১১ বছর পর সর্বশেষ ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার নন-ক্যাডার নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি মাধ্যমিকে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিল। এরপর গত চার বছরেও নতুন শিক্ষক নিয়োগের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) জানিয়েছে, তারা প্রতিবছরই শূন্য পদের তালিকা পাঠায়, কিন্তু সেই ফাইল মন্ত্রণালয়ে আটকে থাকে। মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই এই নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ থমকে আছে।
শিক্ষকরা বলছেন, সংকট নিরসনে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) শুধু শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারে। যেমনটি নার্সদের জন্য করে থাকে। কিন্তু শুধু সদিচ্ছার অভাবে কার্যত অচল সরকারি মাধ্যমিকের নিয়োগ কার্যক্রম। নন-ক্যাডার নিয়োগের মাধ্যমে এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। এতে মান ও ঐতিহ্য সব হারাতে বসেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর সঙ্গে কাজের চাপে শিক্ষকরাও মানসিক উদ্যম হারাচ্ছেন। ব্যাহত হচ্ছে উচ্চতর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ।
মাউশির ২০২৬ সালের ২৫ মার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের মোট পদ আছে ১৬ হাজার ১৪১টি। পুরোনো স্কুলে ১০ হাজার ৮৮৪টি পদ ও ৫ হাজার ২৫৭টি পদ রয়েছে আত্তীকৃত স্কুলগুলোতে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৯৩ জন শিক্ষক কর্মরত। আর ৬ হাজার ৪৮টি শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৩৮ শতাংশ সহকারী শিক্ষক পদ ফাঁকা রয়েছে। ৫৭২টি প্রধান শিক্ষকের মধ্যে ৩৭৯টি পদ শূন্য রয়েছে, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত করছে। শতকরা হিসাবে ৬৬ ভাগের বেশি। একইভাবে এই স্কুলগুলোতে সহকারী প্রধান শিক্ষকের জন্য ৭০২টি পদ তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৫টি পদে সহকারী প্রধান শিক্ষকরা কর্মরত এবং অবশিষ্ট ৫২৭টি পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা রয়েছে।
মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিক্ষকসংকটে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলো চালানো দায় হয়ে পড়েছে। পিএসসির নন-ক্যাডার থেকে নিয়োগের নিয়মের কারণে দীর্ঘ সময় শিক্ষক নিয়োগ কার্যত ঝিমিয়ে পড়েছে। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি তুলে ধরেছি। এখনো সমাধান হয়নি। তবে আশা করছি দ্রুতই সমাধান হবে।’
পিএসসি তো শুধু নার্সদেরও নিয়োগ দেয়। সেখানে নন-ক্যাডার নিয়ম নেই। তবে কেন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া যাচ্ছে না–এমন প্রশ্নে মহাপরিচালক বলেন, ‘তাদের অনেকবার বলেছি। কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কার্যত সমাধান হয়নি।’
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকটের চিত্র
এসএসসিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকটের কারণে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। মাউশির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের উল্লেখযোগ্য সংকট রয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে ১ হাজার ২০টি পদের মধ্যে ৩১৯টি শূন্য, যা মোট পদের ৩১ দশমিক ২৭ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে ৭৮৬টি পদের মধ্যে ২৫৩টি পদ শূন্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শূন্য পদের হার ৩২ দশমিক ১৯ শতাংশ।
বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর মধ্যে জীববিজ্ঞানে ৮৫৪টি পদের মধ্যে ২৫২টি শূন্য, যা মোট পদের ২৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। ভৌত বিজ্ঞান বিষয়ে ৮৮১টি পদের মধ্যে ২১০টি পদ শূন্য রয়েছে। এ বিষয়ে শূন্য পদের হার ২৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ধর্ম বিষয়ে ৯১১টি পদের মধ্যে ২৫৬টি পদ শূন্য, যা মোট পদের ২৮ দশমিক ১০ শতাংশ।
বাংলা বিষয়ে ১ হাজার ৬৮৯টি পদের মধ্যে ৪৫২টি শূন্য রয়েছে। এ বিষয়ে শূন্য পদের হার ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। চারুকলা বিষয়ে ৩৮১টি পদের মধ্যে ১৫৫টি পদ শূন্য, যা মোট পদের ৪০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। শারীরিক শিক্ষা বিষয়েও শিক্ষকসংকট প্রকট। এ বিষয়ে ৪৮৪টি পদের মধ্যে ১৭৩টি শূন্য রয়েছে। ফলে শূন্য পদের হার দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
কৃষিশিক্ষা বিষয়ে ৪৩১টি পদের মধ্যে ১০৮টি শূন্য রয়েছে, যা মোট পদের ২৫ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। গণিত বিষয়ে ১ হাজার ৩১৭টি পদের মধ্যে ২১২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ শূন্য পদের হার ১৬ দশমিক ১০ শতাংশ। ইংরেজি বিষয়ে ১ হাজার ৭০৭টি পদের মধ্যে ২৩৭টি পদ শূন্য রয়েছে। এ বিষয়ে শূন্য পদের হার ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অন্যদিকে ভূগোল বিষয়ে ৪২৪টি পদের মধ্যে ৯৬টি পদ শূন্য, যা মোট পদের ২২ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সব মিলিয়ে প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী চারুকলা, শারীরিক শিক্ষা, ব্যবসায় শিক্ষা ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষকসংকট তুলনামূলকভাবে বেশি।
সরাসরি নিয়োগ বন্ধ কেন
মাউশির দুটি শাখা আছে। একটি হচ্ছে বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখা। অপরটি হচ্ছে কলেজ শাখা। ২০১৮ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সেই নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হয় ২০২২ সালে। ওই সময়ে ২ হাজার ১৫০ জন শিক্ষক নিয়োগ পান। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত প্রায় ১ হাজার ৬০০ শিক্ষক। অর্থাৎ ৫০০-এর বেশি শিক্ষক শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এর আগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ২০১১ সালে। অন্যদিকে কলেজ শাখায় প্রতিবছরই বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এমনকি শূন্য পদ বেশি হলে স্পেশাল বিসিএসের আয়োজন করে পিএসসি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষক নিয়োগ দিতে এক দশক লাগছে। প্রতিবছর ৩০০ শিক্ষক অবসরে যাওয়ায় শিক্ষক পূরণের বদলে উল্টো ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রতিবছরের শিক্ষকসংকটের চিত্র ও পরিসংখ্যান মাউশি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফাইলবন্দি হয়ে থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখে না। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ বিধিমালা নিয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করতে গিয়েই দীর্ঘ সময় অপচয় হয়।
সরকারি মাধ্যমিকের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিপুলসংখ্যক পদ ফাঁকা থাকার কারণে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক ইংরেজি পড়াচ্ছেন। আবার ধর্মের শিক্ষককে গণিত পড়াতে হচ্ছে। যে কারণে শিখনদক্ষতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ বছর এসএসসিতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে পাস করতে পারেনি। যার মূল কারণ ৮০ শতাংশ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেই। যে কারণে কোচিং-নির্ভরতা এবং নোট বই ও গাইড বইয়ের প্রতি ঝুঁকছেন শিক্ষার্থীরা। অনেকের অনলাইন-নির্ভরতাও বেড়েছে।
পদ সৃজনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
সরকারি মাধ্যমিকের স্কুলগুলোতে পদ সৃজনেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। ৩২৩টি পুরোনো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ হাজার ৭৫৬টি সহকারী শিক্ষক পদ তৈরির জন্য ২০২৩ সালে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পদগুলো সৃজনের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষকরা জানান, বেসরকারি থেকে স্কুলগুলো যখন সরকারীকরণ হয়, তখন স্কুলে ২৫টি শিক্ষকের পদের ধরন থাকে। কিন্তু সেই ধরন অনুযায়ী পদ সৃজন করা হয় না। আর সৃজন না করায় সরাসরি নিয়োগও দেওয়া যায় না। যে কারণে ৭০২টি স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদের পরিবর্তে পদ রয়েছে মাত্র ৫৭২টি। একইভাবে ১৯৩টি স্কুলে ডাবল শিফট রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃজন হওয়ার কথা ৯০৩টি। কিন্তু সিংহভাগ পদ তৈরি হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানে কার্যত শিক্ষক পদ থাকার কথা ২২ হাজার ৫৭৫টি। কিন্তু পদ রয়েছে মাত্র ১৬ হাজারের কিছু বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি মাধ্যমিকের জন্য ২০১৪ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সুষ্ঠু পদবিভাজন করে দেয়। কিন্তু আজ অবধি তার বাস্তবায়ন হয়নি।
অতিথি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম চলছে
পাঠদান চালিয়ে নিতে অনেক প্রতিষ্ঠানেই অতিথি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও দায়বদ্ধতা না থাকায় এই পদক্ষেপ সেভাবে কাজে আসছে না। মূলত বেকার শ্রেণির একটি অংশ অল্প বেতনে স্কুলগুলোতে যুক্ত হচ্ছে। পছন্দের চাকরি পেলেই তারা স্কুল থেকে চলে যাচ্ছেন। এর পরও স্কুলগুলোতে একজন শিক্ষককে প্রতি সপ্তাহে ২৫-৩০টি ক্লাস নিতে হচ্ছে, যা আদর্শ মানের চেয়ে অনেক বেশি। কাজের চাপ বেশি হওয়ায় শিক্ষকদের মানসিক অবস্থাও খারাপ থাকে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী পদ তৈরির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষিত রাখতে হয়। প্রেষণ, পদায়ন, পিএইচডিজনিত বা বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসব পদ সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগের সময় এই ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণ করা হয় না। এর ফলে উচ্চতর ডিগ্রি, প্রশিক্ষণ গ্রহণেরও সুযোগ মেলে না। অনেকে স্নাতকোত্তরও করতে পারেন না। শিক্ষকদের অভিযোগ, উল্টো শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশিক্ষণ ও পিএইচডির জন্য শিক্ষকদের নিরুৎসাহিত করছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, একটি পেশাদার সিভিল সার্ভিসের আদলে ‘ন্যাশনাল টিচিং সার্ভিস কোর’ গঠন করে মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক বেতন-ভাতা দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া দরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এমন সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার সেই সুপারিশগুলো আমলে নেয়নি। বিচ্ছিন্ন ও আংশিক কিছু উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বর্তমান সরকার। তবে শিক্ষকসংকট নিয়ে শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
