সামনে এল ক্লাসিকো। তার আগে নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যের জানান দিতে এর চেয়ে ভালো মঞ্চ আর কী হতে পারত! উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে জার্মান ক্লাব লাইপজিগকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বার্সেলোনার বিপক্ষে লড়াইয়ের প্রস্তুতিটা দারুণভাবেই সেরে নিল রিয়াল মাদ্রিদ। শুধু বড় জয়ই নয়, এই রাতে নিজেদের ইউরোপীয় আধিপত্যের ইতিহাসেও নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে স্প্যানিশ জায়ান্টরা!
গত রাতে ম্যাচের শুরুটা অবশ্য রিয়ালের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। দুই দলই প্রথম দিকে খেলেছে কিছুটা হিসাব-নিকাশ করে। বরং আক্রমণে কয়েকবার রিয়ালকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে লাইপজিগ। ২৮ মিনিটে রোমুলোর শট ঠেকিয়ে দলকে বিপদমুক্ত করেন থিবো কোর্তোয়া। বিরতির ঠিক আগে ক্রিস্টোফার এনকুনকুর প্রচেষ্টাও দুর্দান্তভাবে রুখে দেন বেলজিয়ান গোলরক্ষক। স্কোরলাইন যতটা একপেশে, মাঠের লড়াইয়ের শুরুটা ছিল ততটা নয়।
তবে ম্যাচের ৪৩ মিনিটে যেন খুলে যায় রিয়ালের গোলের দরজা। আরদা গুলেরের শট থেকে ফিরে আসা বলে জাল খুঁজে নেন বের্নার্দো সিলভা। রিয়ালের জার্সিতে পর্তুগিজ মিডফিল্ডারের এটিই প্রথম গোল। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি গোলটি হয়ে ওঠে ক্লাবের ইতিহাসের অংশ। কারণ, এই গোলের মধ্য দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্নাব্যুতে টানা ৪৫ ম্যাচে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়ে রিয়াল। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ঘরের মাঠে টানা এত ম্যাচে গোল করার কৃতিত্ব আর কোনো দলের নেই।
বিরতির পর রিয়ালের আক্রমণের ধার আরও বাড়ে। ৫২ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আরদা গুলের। জুড বেলিংহামের ক্রস থেকে কিলিয়ান এমবাপের হেডে পাওয়া বল কাছ থেকে জালে পাঠান তুর্কি তরুণ। এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় স্বাগতিকেরা।
৮৩ মিনিটে নিজের নামও গোলদাতার তালিকায় তুলে নেন এমবাপে। ইয়ান দিওমান্দের পাস থেকে বাঁকানো শটে লাইপজিগের জালে বল পাঠান ফরাসি তারকা। চলতি মৌসুমে ১২ ম্যাচে এটি তার ১২তম গোল। গোল করার ক্ষেত্রে ম্যাচপ্রতি একটির দুর্দান্ত গড় ধরে রেখেছেন তিনি।
তবে রিয়ালের রাতের গল্পে এমবাপের পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ইয়ান দিওমান্দেও। ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর দুই মিনিটের ব্যবধানে একটি গোল শোধ করে লাইপজিগের তিদিয়াম গোমিস। কিন্তু তাতে স্বাগতিকদের উৎসব থামেনি। ৮৭ মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজের ক্রস থেকে দুর্দান্ত ভলিতে গোল করে বড় জয় নিশ্চিত করেন দিওমান্দে।
ম্যাচের পর রিয়াল কোচ জোসে মরিনিওর কথাতেও উঠে এসেছে এমবাপে ও দিওমান্দের পারফরম্যান্স। তার মতে, এই দুই খেলোয়াড়ের জুটি দেখে সমর্থকেরা আনন্দ নিয়েই বাড়ি ফিরেছেন। দিওমান্দের পারফরম্যান্স চোখে পড়ার মতো, এই ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জায়গায় মাঠে নেমে তিনি গোলও করেছেন, করিয়েছেনও!
ভিনিসিয়ুসকে অবশ্য পুরোপুরি আড়ালে রাখতে চাননি মরিনিও। সাম্প্রতিক সময়ে গোলখরায় থাকা এই উইঙ্গারকে ৭০ মিনিটে তুলে নিলেও তার পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট কোচ। সর্বশেষ দুই ম্যাচে কোনো সফল ড্রিবলিং করতে না পারা এবং শেষ নয় ম্যাচে গোল না পাওয়ায় ভিনির ছন্দ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এ মৌসুমে ১১ ম্যাচে তার গোল মাত্র একটি। তবে মরিনিও মনে করেন, দলের জন্য আরও বেশি কিছু দিতে চাওয়ার তাগিদ থেকেই ভিনিসিয়ুসের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে লাইপজিগের জন্য এই হার আরও একটি হতাশার রাত। দুই ম্যাচেই ১০ গোল হজম করে পয়েন্ট তালিকার ২৯তম স্থানে নেমে গেছে জার্মান ক্লাবটি। বিপরীতে চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা তিন জয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে রিয়াল।
তবে এই জয়ের আসল পরীক্ষা অপেক্ষা করছে সামনেই। আগামী রোববার লা লিগায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার মুখোমুখি হবে মাদ্রিদের ক্লাবটি। ক্যাম্প ন্যুতে সেই লড়াইকে সামনে রেখে আত্মবিশ্বাসী মরিনিও। তার কাছে এটি অন্য ম্যাচগুলোর মতো সাধারণ লিগ ম্যাচ নয়, যদিও প্রস্তুতির প্রশ্নে দলের ওপর তার আস্থা স্পষ্ট!
এদিকে ইউরোপের অন্য মাঠগুলোতেও ছিল জমজমাট লড়াই। আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় বায়ার্ন মিউনিখ ও আর্সেনাল ২-২ গোলে ড্র করেছে। হ্যারি কেইনের পেনাল্টি গোলে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত জয় পায়নি জার্মান চ্যাম্পিয়নরা। ৮২ মিনিটে ডেকলান রাইসের গোলে সমতা ফেরায় আর্সেনাল। ফলে টানা দুই ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে বায়ার্নকে।
অন্যদিকে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দুঃসময় যেন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। ইতালিতে কোমোর কাছে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে হেরেছে তারা। দুই গোল ও এক অ্যাসিস্ট করে ম্যাচের নায়ক হয়েছেন নিকো পাজ। এই হারে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা সাত ম্যাচ জয়হীন থাকল ইউনাইটেড। বিপরীতে চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজেদের মাঠে অভিষেক মৌসুমে টানা দ্বিতীয় জয়ে নতুন করে আলোচনায় কোমো।
ইউরোপীয় রাতের সবচেয়ে বড় বার্তা এসেছে মাদ্রিদ থেকে। বার্নাব্যুতে গোলের ধারা অব্যাহত, এমবাপ্পের গোল-রেকর্ডের দৌড় এবং দিওমান্দের উত্থান-সবকিছু মিলিয়ে এল ক্লাসিকোর আগে রিয়াল নিজেদের প্রস্তুতির জানান দিয়েছে জোরালোভাবেই!
