দেহের অভ্যন্তরীণ জৈব ঘড়ির গোলযোগের সঙ্গে যুক্ত বিষণ্ণতার এক নতুন উপধরন ‘সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মনস্তাত্ত্বিক বিষণ্ণতা বা অবসাদের একটি নতুন উপধরনের সন্ধান মিলেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন’। নাম থেকেই অনুমান করা যায়, মানবদেহের বায়োলজিক্যাল ক্লকের গোলযোগের সঙ্গে এই মানসিক ব্যাধিটি সরাসরি যুক্ত।
চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত এই গবেষণায় জৈবিক, ক্লিনিক্যাল এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে মেজর ডিপ্রেশনকে নির্দিষ্ট একটি 'সার্কাডিয়ান উপধরনে' বিভক্ত করা সম্ভব কিনা তা বিশ্লেষণ করা হয়।
আরও পড়ুন
অস্ট্রেলিয়ান জেনেটিক্স অব ডিপ্রেশন স্টাডির আওতায় বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর এই ক্লিনিক্যাল ও জিনগত বিশ্লেষণ পরিচালনা করেন গবেষকরা।
মেজর ডিপ্রেশনে আক্রান্ত অনেক রোগীই প্রচলিত বিষণ্ণতারোধী ওষুধে সাড়া দেন না, কারণ প্রচলিত চিকিৎসায় সবাইকে একই ধরনের বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মনে করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেহের জৈব ঘড়ির ভারসাম্যহীনতা যেমন অনিয়মিত ঘুমের ধরণ, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিক অবস্থার তারতম্য এবং অন্যান্য ঘুমজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ‘সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন’ কীভাবে লক্ষণ ও জিনগত দিক থেকে অন্যান্য বিষণ্ণতা থেকে পৃথক, তা উদ্ঘাটন করা।
ইউনিভার্সিটি অব সিডনির ব্রেন অ্যান্ড মাইন্ড সেন্টারের গবেষক এবং উক্ত গবেষণার প্রধান লেখক এমিলিয়ানা তোনিনি বলেন, ‘আমাদের গবেষণা সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনকে একটি নতুন উপধরনের অবসাদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা আমাদের গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় এক- চতুর্থাংশ মানুষকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে যারা তীব্র, বারবার ফিরে আসা বা দীর্ঘস্থায়ী অবসাদে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা গেছে।’
সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের মূল লক্ষণসমূহ
এই উপধরনের অবসাদে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মূলত ঘুম-জাগরণ সংক্রান্ত এবং ঋতুভিত্তিক কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা যায়। সকালে অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি, অবসাদের পর্বগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে ঘুমানো, গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকার প্রবণতা, ঘুমের মধ্যবর্তী সময়ে বিলম্ব ঘটা, সামাজিক জীবন ও দেহের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির মধ্যে সমন্বয়হীনতা, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থতার নির্দিষ্ট ধরণ প্রকাশ পাওয়া।
গবেষক তোনিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিষণ্ণতা কোনো একঘেয়ে বা একক ধরণের রোগ নয়। বিভিন্ন উপধরনের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো বুঝতে পারলে আমরা রোগীদের অনেক আগেই তাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারব।
অন্যান্য বিষণ্ণতার সঙ্গে বৈষম্য ও শারীরিক ঝুঁকি
সাধারণ অবসাদে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তুলনায় সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনে আক্রান্তদের মধ্যে কিছু স্পষ্ট তফাৎ দেখা গেছে:
১) সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বয়সের দিক থেকে তুলনামূলক তরুণ। যেখানে সাধারণ অবসাদগ্রস্তদের গড় বয়স ২৩.২ বছর, সেখানে সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন আক্রান্তদের গড় বয়স ১৮.৭ বছর।
২) আক্রান্তদের বড় একটি অংশই নারী যা প্রায় ৮০ শতাংশ।
৩) তুলনামূলক কম বয়সেই রোগের সূচনা ঘটে।
৪) রোগের তীব্রতা অনেক বেশি থাকে, যার মধ্যে হাইপোম্যানিক বা ম্যানিক-সদৃশ লক্ষণ (বাইপোলার ডিসঅর্ডারের লক্ষণ), সাইকোটিক অনুভূতি, আত্মহত্যার চিন্তার তীব্রতা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি ও সোমাটিক সমস্যাসহ নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা যায়।
চিকিৎসায় প্রতিক্রিয়া ও ভিন্ন পথ
গবেষণায় দেখা গেছে, সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীরা প্রচলিত সেরোটোনিন-ভিত্তিক বিষণ্ণতারোধী ওষুধ যেমন এসএসআরআই এবং এসএনআরআই থেকে আশানুরূপ সুফল পান না বললেই চলে। অন্যদিকে, দেহের অভ্যন্তরীণ জৈব ঘড়ি পরিচালনকারী মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোকে লক্ষ্য করে যেসব আচরণগত ও চিকিৎসাগত পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় যেমন মেলাটোনিন, মেলাটোনিন-ভিত্তিক ওষুধ এবং লাইট থেরাপি তাতে এরা দ্রুত সাড়া দেন। এই আবিষ্কারটি ব্যাখ্যা করে যে কেন তরুণ রোগীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রথম সারির ওষুধগুলো প্রায়শই ব্যর্থ হয়।
গবেষণাপত্রের সহ-লেখক এবং ব্রেন অ্যান্ড মাইন্ড সেন্টারে কো-ডিরেক্টর চিল্ড্রেনস ও ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট ড. ইয়ান হিকি জোর দিয়ে বলেন, তরুণদের মধ্যে সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন শনাক্ত করতে না পারার কারণেই প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যর্থ হয় এবং ওষুধের নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তার মতে, বিষণ্ণতায় আক্রান্ত অধিকাংশ তরুণকে শুরুতেই এসএসআরআই দেওয়া হলেও অন্তত এক-চতুর্থাংশ রোগীর জন্য জৈব ঘড়ি-কেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থাই অধিক কার্যকর।
গবেষকরা উপসংহারে জানান, সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন কেবল ঘুমের কিছু আকস্মিক বা এলোমেলো সমস্যার সমষ্টি নয়, বরং এটি চিকিৎসাগত ও জৈ বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ স্বীকৃত একটি সুনির্দিষ্ট মানসিক ব্যাধি।সূত্র: এডিটিভি
খাদিজা রুমি/
