ইহুদি ধর্মগুরু রাব্বি ডভ লিওর গত শুক্রবার একটি ধর্মীয় ফতোয়া দিয়েছেন। এতে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জলপাইবাগান থেকে জলপাই সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি ইহুদি বসতিগুলো থেকে অনেক দূরের এলাকাও এর আওতাভুক্ত।
তার যুক্তি, জমিটি ঐতিহাসিকভাবে ইহুদিদের সম্পত্তি এবং নিরাপত্তার কারণে যেসব ফিলিস্তিনিকে তাদের গাছে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, তারা জলপাইয়ের ফলের ওপর অধিকার ছেড়ে দিয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তিনি লিখেছেন, এসব জলপাই সংগ্রহের মাধ্যমে ভূমি বিজয়ের ধর্মীয় নির্দেশনাও পালন করা সম্ভব।
এ ধরনের ফতোয়া নিঃশর্তভাবে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। অন্যের জীবিকা কেড়ে নেওয়ার পক্ষে ধর্মীয় অনুমোদন দেওয়ার পরিণাম ভোগ করতে হয়। এর প্রভাব পড়ে কৃষকের ওপর, যারা ফসল কেড়ে নিতে উৎসাহিত হয় তাদের ওপর এবং যে সমাজ এমন কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেয়, তাদের ওপরও।
‘অর টোরাহ স্টোন’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট ও রোশ ইয়েশিভা রাব্বি কেনেথ ব্র্যান্ডার এর বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। ইহুদি ধর্মীয় আইনের বিভিন্ন উৎস তুলে ধরে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, এই ভূমির সঙ্গে ইহুদি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেও তা সেখানকার অ-ইহুদি বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেয় না। কোনো ভূখণ্ডের ওপর জাতীয় দাবি থাকলেই নির্দিষ্ট কোনো জলপাইবাগানের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। কোনো ব্যক্তি নিজের গাছে পৌঁছাতে না পারার অর্থ এই নয় যে, তিনি গাছের ফলের ওপর অধিকার ছেড়ে দিয়েছেন।
ব্র্যান্ডারের অবস্থান সমর্থন করা উচিত। ফিলিস্তিনিদের জলপাই কেড়ে নেওয়ার বিরোধিতা করা গুশ এতজিয়নের রাব্বিদেরও সমর্থন প্রাপ্য। একইভাবে তাদের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে তজোহার রাব্বিনিক্যাল সংগঠন। তাদের এই উদ্যোগ বর্তমান সময়ে ধর্মীয় নেতৃত্বের যে ভূমিকা প্রয়োজন, তারই উদাহরণ। শ্রেণিকক্ষ, উপাসনালয় এবং জলপাইবাগানের কাছাকাছি বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।
ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর কাছে জলপাইয়ের মৌসুম মানে তাদের পরিচর্যা করা জমি ও গাছ থেকে আয় করার সুযোগ। কেউ যদি জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তুলতে চান, তাহলে তাকে প্রমাণ হাজির করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। বস্তা হাতে হাজির হয়ে ঐশী প্রতিশ্রুতির কথা বলে ফসল নিয়ে যাওয়া এমন এক অস্বাভাবিক পদ্ধতি, যেখানে একজন ব্যক্তি নিজেকেই বিচারক, সুবিধাভোগী ও আইন প্রয়োগকারী হিসেবে নিয়োগ করেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে ইসরাইলের
নিজ দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া ইসরাইলের দায়িত্ব। প্রকৃত নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে কৃষিজমিতে প্রবেশ সীমিত করার প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীকে সে ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে। তবে এ ধরনের বিধিনিষেধের কারণে যাদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের প্রতিও দায়িত্ব তৈরি হয়। যেখানে সম্ভব, সামরিক কমান্ডারদের নিরাপদে জলপাই সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে এবং জমিতে প্রবেশ বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে অন্য কেউ যাতে ফসল কেড়ে নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কৃষককে তার জলপাইবাগানে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা হলে, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি অন্তত তার বাগানের অবশিষ্ট ফসলের সুরক্ষা প্রত্যাশা করতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত বিপদের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ব্র্যান্ডার তার অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আমি আমাদের তরুণদের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে লিখছি, যারা সঠিক দিকনির্দেশনা খুঁজছে।’ কোনো তরুণ যখন শোনে, প্রতিবেশীর জলপাই নিয়ে নেওয়া ধর্মীয় নির্দেশনা পালনের শামিল, তখন সে বুঝতে শেখে কার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ আর কার অধিকার নয়। যারা এ ধরনের শিক্ষা দেন, তাদের উৎসাহিত করা আচরণের দায়ও তাদের নিতে হবে।
ইহুদি শিক্ষায় ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক ও সংযুক্তির পাশাপাশি সংযমের শিক্ষাও দিতে হবে। অন্যের অধিকার রক্ষা করা যখন অসুবিধাজনক, রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় কিংবা আবেগগতভাবে কঠিন হয়ে পড়ে, তখনও সেই অধিকার যে অবশ্যই মানতে হবে, তা শেখাতে হবে। ধর্মীয় অঙ্গীকারের দৃঢ়তা তখনই পরীক্ষিত হয়, যখন সেই অঙ্গীকার পালন করতে গিয়ে বিশ্বাসী ব্যক্তিকে নিজের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা মেনে নিতে হয়।
আব্রাহাম ও লোটের রাখালদের মধ্যকার বিরোধ সম্পর্কে রাশি-র ব্যাখ্যার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ব্র্যান্ডার। লোটের রাখালরা আব্রাহামকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির দোহাই দিয়ে অন্যের জমিতে পশু চরানোকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অন্যদিকে আব্রাহামের রাখালরা তাদের চুরির জন্য তিরস্কার করেছিলেন। বাইবেলের এই ঘটনা ধর্মীয় শিক্ষকদের জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ হতে পারে, যার মাধ্যমে তারা ঐশী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন।
জেরুজালেম পোস্ট ইহুদি জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের আবাসভূমিতে জাতীয় জীবন গড়ে তোলার অধিকারকে সমর্থন করে। তবে এই অধিকার চর্চার জন্য এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যেগুলো ইহুদিদের অন্যায় কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের অধীন থাকা মানুষদের সুরক্ষা দিতে সক্ষম। এ দায়িত্ব পালনে প্রতিটি ব্যর্থতা জনসাধারণের আস্থা দুর্বল করে এবং নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করে।
লিওরের ফতোয়া প্রত্যাখ্যান করতে হবে
ধর্মীয় জায়নবাদী নেতাদের এই ফতোয়া স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করা উচিত। বসতি স্থাপনকারী নেতাদের বাসিন্দাদের জানিয়ে দিতে হবে, অনুমতি ছাড়া ফিলিস্তিনিদের ফসল নিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চুরি ও হামলার অভিযোগ পুলিশকে তদন্ত করতে হবে। আর সামরিক কমান্ডারদের নিশ্চিত করতে হবে, নিরাপত্তার কারণে আরোপিত বিধিনিষেধ যেন ব্যক্তিগত লাভের সুযোগে পরিণত না হয়। মালিকানা নিয়ে বিরোধের যথাযথ শুনানি হতে হবে; কোনো কৃষক ফিলিস্তিনি হওয়ার কারণে তার জমির মালিকানা নির্ধারিত হতে পারে না।
যারা ইতোমধ্যে ফসল নিয়ে গেছেন, তাদের তা ফেরত দিতে হবে। জলপাই বিক্রি হয়ে গিয়ে থাকলে কর্তৃপক্ষকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগ নিতে হবে। জনসমক্ষে নিন্দা তখনই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে, যখন সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় প্রতিবেশীদের ওপর করা ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্যও আন্তরিক উদ্যোগ নেয়।
জলপাই সংগ্রহের ছবি কে তুলছে কিংবা কোন বিদেশি সরকার নিন্দা জানাচ্ছে, তার ওপর এসব দায়িত্ব নির্ভর করে না। একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের ক্ষতি নিজের বিবেচনাতেই গুরুত্বপূর্ণ। যেসব রাব্বি ওই পরিবারের সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় কথা বলছেন, তাদের প্রকাশ্যে সমর্থন জানানো উচিত। একই সঙ্গে কৃষকদের দেখতে হবে, সেই সমর্থন বাস্তবে তাদের সুরক্ষায় রূপ নিচ্ছে।
জলপাই সংগ্রহের মৌসুম এখন চলছে। কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, কৃষকরা কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, কীভাবে জমিতে প্রবেশের সমন্বয় করা হবে এবং তাদের ফসল কেড়ে নেওয়া হলে কে ব্যবস্থা নেবেন।