The Sangbad · সাধারণ
কুশিয়ারার ভাঙনে নবীগঞ্জে অর্ধশতাধিক বসতভিটা বিলীন
১৩/১০/২০২৬

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় কুশিয়ার নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নদী তীরবর্তী জনপদ। নদীর পানি বৃদ্ধি ও প্রবল ঘূর্ণিস্রোতের আঘাতে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।ভাঙনের মুখে রয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। বসতভিটা হারিয়ে কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, আবার কেউ কুশিয়ারা ডাইকের (বাঁধ) ওপর পলিথিনের ছাউনি টাঙিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কুশিয়ারা ডাইক মেরামত করা হলেও নদীভাঙনের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না এলাকা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চলতি মাসেই প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন বহু মানুষ।নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জ, দীঘলবাক ও আউশকান্দি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদীর অপর পাড়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে দুই উপজেলার বহু পরিবার বসতভিটা হারিয়ে বিপাকে পড়েছে। বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে অনেক পরিবারের ভবিষ্যৎ।দীঘলবাক ইউনিয়নের সাবেক সদস্য মো. ফখরু মিয়া বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন দেখা দিলেও এবার কুশিয়ারা নদীর ঘূর্ণিস্রোতের আঘাতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রাম ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। মাত্র একদিনেই প্রায় ৫০০ মিটার এলাকার ধানখেত নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।’একই এলাকার বাসিন্দা ড. শাহ ইউসুফ আলী বলেন, ‘হঠাৎ ভাঙন শুরু হওয়ায় অনেক পরিবার ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পায়নি। নদীর আগ্রাসনে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।’স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাজেদ মিয়ার বাগানসহ তার বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যদিকে রামরগাঁও গ্রামের রইছ আলী নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে ১০ সদস্যের পরিবার নিয়ে এখন কুশিয়ারা ডাইকের ওপর পলিথিনের ছাউনি টাঙিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।দীঘলবাক গ্রামের বাসিন্দা ও স্কুলশিক্ষিকা নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ‘পৈতৃক ভিটেমাটি ও পুরো এলাকা চোখের সামনে ভেঙে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে ভাঙনের এমন ভয়াবহ রূপ আর দেখা যায়নি।’ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কুশিয়ারা নদীর ভাঙন তীব্র হয়েছে। গত এক সপ্তাহে এলাকার ২৫ থেকে ৩০টি গ্রামের বহু ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে।নদীগর্ভে বিদ্যালয়ের জায়গাকুশিয়ারা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দীঘলবাক উচ্চবিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুস সালাম জানান, গত ছয় থেকে সাত বছরের ধারাবাহিক ভাঙনে বিদ্যালয়ের ১০ থেকে ১২টি ভবন ও খেলার মাঠসহ সম্পূর্ণ জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে মূল অবস্থান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করতে হয়েছে।ঝুঁকিতে অন্তত ১০ ইউনিয়নআউশকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দিলোয়ার হোসেন বলেন, নবীগঞ্জ, জগন্নাথপুর ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১০টি ইউনিয়নের মানুষ কুশিয়ারা নদীর তীরে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। গত এক সপ্তাহে নদী তীরবর্তী এলাকায় অন্তত দুই শতাধিক পরিবার বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।দীঘলবাক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালিক মিয়া বলেন, ‘কুশিয়ারা নদী আমাদের জন্য এক অভিশাপ। নদীভাঙনে গৃহহারা হয়ে কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, কেউ খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। কুশিয়ারার ভাঙন আমাদের সবকিছু শেষ করে দিচ্ছে।’৩০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পহবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ছায়েদুর রহমান জানান, কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে শুধু নবীগঞ্জ নয়, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচংসহ সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে কুশিয়ারা ডাইক মেরামতের জন্য নতুন করে ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চলতি মাসেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।নদীভাঙনে একের পর এক পরিবার বসতভিটা হারালেও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗