আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় এড়াতে মিথ্যা বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের সাবেক প্রধান রোনেন বার। তাঁর অভিযোগ, হামলার আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে নেতানিয়াহু যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা মানহানিকর এবং নিজের দায় আড়াল করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
১৪ অক্টোবর বুধবার ১৩৪ পৃষ্ঠার নথিসহ মামলাটি দায়ের করা হয়। ইসরায়েলের রাজনীতিতে এ ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
মামলার নথিতে রোনেন বার দাবি করেন, হামলার সম্ভাব্য ইঙ্গিত পাওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিবকে ফোন করেছিলেন। সরাসরি নেতানিয়াহুর সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর তাঁর কাছে ছিল না বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর দাবি, ওই দিন ভোরে হামলার বিষয়ে রোনেন বার তাঁকে আগাম কোনো তথ্য দেননি। তাঁর বক্তব্য, শিন বেতের তৎকালীন প্রধান কিংবা সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যদি তাঁকে ফোন করে সতর্ক করতেন, তাহলে হামলা ঠেকানোর সুযোগ তৈরি হতে পারত।
রোনেন বারের অভিযোগ, নেতানিয়াহু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছেন, যাতে ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় থেকে নিজেকে আড়াল করতে পারেন। তাঁর দাবি, নেতানিয়াহুর সরকারের কয়েক বছরের নীতির কারণে গাজায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি আরও বেড়েছিল।
রোনেন বারের অভিযোগের জবাবে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দলটির বক্তব্যে প্রশ্ন তোলা হয়, বারের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি যোগাযোগের নম্বর থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন তাঁকে ফোন করেননি।
দলটির দাবি, সময়মতো একটি ফোন করা হলে আরও অনেক মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারত। তবে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ২০২৫ সালের জুনে শিন বেতের প্রধানের পদ ছাড়েন রোনেন বার। শুরু থেকেই তাঁর দাবি, হামলার আশঙ্কার বিষয়টি তিনি আগেই নেতানিয়াহুকে জানিয়েছিলেন।
ফোনালাপের সময় পরিবর্তনের অভিযোগ
রোনেন বারের মামলা দায়েরের কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহুর সাবেক সামরিক সচিব অবি গিল অভিযোগ করেন, ৭ অক্টোবরের হামলার দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ফোনালাপের নথি পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অবি গিল জানান, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক নথি সংরক্ষণকারী কর্মী তাঁকে বলেছিলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে একটি ফোনালাপের সময় পরিবর্তন করতে বলা হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় সময় ভোর ৬টা ৪০ মিনিটের চার মিনিটের ফোনালাপের সময় ভোর ৬টা ২৯ মিনিট দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই কর্মী তা পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানান বলে দাবি করেন গিল।
এ অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে নথি পরিবর্তনের বিষয়টি এখনো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
এদিকে, গত মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হামাসের হামলার কয়েক দিন আগে মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান আব্বাস কামেলও নেতানিয়াহুকে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ইসরায়েল সফর করে দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা নিয়েও আলোচনা করেছিলেন।
তবে এসব সতর্কবার্তার বিষয়ে ইসরায়েলি সরকারের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
নির্বাচনের আগে চাপে নেতানিয়াহু
আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহু সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা, সরকারি আমলা ও বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে রয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং হামলার আগে পাওয়া সতর্কবার্তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন নির্বাচনী বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন। এ ছাড়া ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। জিম্মিদের মধ্যে হামলার দিন নিহত ব্যক্তিদের মরদেহও ছিল।
অন্যদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল, আল জাজিরা
