এখন আমাদের সামনে আরো বড় লক্ষ্য রয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ইডকলের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কিছু বলতে গেলে যাত্রার শুরুতে ফিরে যেতে হবে। ২০০২ সালে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ ছিল না। দেশে বিদ্যুতায়নের হার ছিল ৪০ শতাংশের নিচে। গ্রামীণ জনপদের বড় একটি অংশ ছিল জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে। এসব এলাকায় গ্রিডের বিদ্যুৎ কখন পৌঁছবে, তা ছিল অনিশ্চিত। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য যে বিনিয়োগ দরকার ছিল, তা করার সক্ষমতাও সীমিত ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে ইডকল একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নেয়—সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি। এর আওতায় প্রতিটি বাড়ির জন্য ছোট, স্বতন্ত্র সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হতো। উদ্দেশ্য ছিল বাড়ির মৌলিক আলোর চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। সে সময়ের বাস্তবতায় এটি ছিল একটি কার্যকর সমাধান।
সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচির আওতায় আমরা ৪৩ লাখ বাড়ি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি। তবে শুরুটা সহজ ছিল না। তখন সৌরপ্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল খুবই সীমিত। এমনকি এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে যুক্ত আমাদের অনেকেরও প্রযুক্তিটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছিল না। মানুষকে সরাসরি দেখিয়ে বোঝাতে হয়েছে, সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এটি কোনো জাদুমন্ত্র নয়, বরং বিজ্ঞানের মাধ্যমে সম্ভব একটি প্রযুক্তিগত সমাধান।
সেই সময় থেকে আজকের বাংলাদেশে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে মানুষের পরিচিতি ও সচেতনতা অনেক বেড়েছে। এ পরিবর্তন আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটি বিশ্বের বৃহত্তম অফগ্রিড সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ অর্জন শুধু একটি প্রকল্পের সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক।
সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা শুধু বাড়িতে আলো পৌঁছে দিইনি; মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবিকার উন্নয়নেরও সুযোগ তৈরি করেছি। একটি গ্রামের শিশুর কথা ভাবুন। আগে রাতে পড়াশোনার জন্য তার প্রধান ভরসা ছিল কেরোসিনের কুপি। সৌরবিদ্যুৎ আসার পর সে তুলনামূলক ভালো আলোয় পড়াশোনা করতে পেরেছে এবং তার পড়ার সময় বেড়েছে। একইভাবে যে দোকানটি সন্ধ্যার পর বন্ধ হয়ে যেত, সৌরবিদ্যুতের কারণে সেটি আরো বেশি সময় খোলা রাখা সম্ভব হয়েছে। এভাবে ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এ কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো কার্বন রাজস্ব। সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ এখনো কার্বন রাজস্ব পাচ্ছে। এ পর্যন্ত এ খাত থেকে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি রাজস্ব এসেছে। প্রায় তিন মাস আগে এ কর্মসূচির মাধ্যমে আরো ১ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের কার্বন রাজস্ব দেশে এসেছে। আগামী কয়েক বছরও এ কর্মসূচি থেকে রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নের পাশাপাশি এ কর্মসূচি দেশের জন্য আর্থিক সুবিধাও তৈরি করছে।
সোলার হোম সিস্টেমের সাফল্য থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় উদ্যোগ নেয়ার সক্ষমতা ও সাহস পেয়েছি বলে আমি মনে করি। এর পর আমরা উৎপাদনশীল কাজে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিই। এর ধারাবাহিকতায় সৌর মিনি-গ্রিড ও সৌর সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) ও মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্ট (এমপিপি) প্রকল্পেও ইডকলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ইডকলের অগ্রণী ভূমিকা আরো বিস্তৃত হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ইডকল অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
এখন আমাদের সামনে আরো বড় লক্ষ্য রয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট আসার কথা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে। ইডকলের পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আমরা মনে করি, সরকারের এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার সক্ষমতা ইডকলের রয়েছে।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে আমরা নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছি, যার নাম ডোমেস্টিক রুফটপ সোলার বা ডিআরএস। দেশের আবাসিক ভবনগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যেতে পারবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে আধাপাকা ও পাকা বাড়ির সংখ্যা ১ কোটি ৬৩ লাখ। এসব বাড়ির অর্ধেকেও যদি চার কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যায়, তাহলে প্রায় ৩৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এ হিসাব থেকেই বোঝা যায়, আবাসিক ভবনের ছাদকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ কতটা বড়।
ডিআরএস কর্মসূচিতে আমরা সোলার হোম সিস্টেমের সফল মডেলকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। এ কর্মসূচিতে চাহিদা সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যায়ে গ্রাহকদের কাছে সৌরবিদ্যুতের সমাধান পৌঁছে দেবে। প্রস্তাবিত অর্থায়ন মডেলে বাড়ির মালিক মোট ব্যবস্থার ব্যয়ের ২০ শতাংশ অগ্রিম দেবেন। চাহিদা সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান ২০ শতাংশ ইকুইটি বিনিয়োগ করবে। বাকি ৬০ শতাংশ অর্থ সহজ শর্তে পুনঃঅর্থায়ন হিসেবে দেবে ইডকল।
এ ব্যবস্থায় গ্রাহক, উদ্যোক্তা ও ইডকল যৌথভাবে অর্থায়নের দায়িত্ব নেবে। ফলে বাড়ির মালিকের ওপর এককালীন বিনিয়োগের চাপ কমবে এবং সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ আরো সহজলভ্য হবে। আমরা খুব শিগগিরই কর্মসূচিটি মাঠপর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। একই সঙ্গে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছি, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনে অর্থায়ন আরো সহজ করা যায়।
আমরা মনে করি, আগামী গ্রীষ্মের আগে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে সহায়তা করবে ডিআরএস কর্মসূচি। এ উদ্যোগ সফল হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারেও নতুন গতি আসবে।
জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখন আর শুধু বিদ্যুৎ খাতের নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ খাতের কোনো একটি প্রকল্প বা উদ্যোগের বিষয় নয়; বরং দেশের বিভিন্ন খাতের পরিকল্পনার সঙ্গে এটিকে যুক্ত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ও সম্ভাবনার মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র স্থাপন করতে পারলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে।
ইডকল সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে। সোলার হোম সিস্টেমের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন আমরা আরো বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ করতে চাই। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রাখাই আমাদের উদ্দেশ্য।
এসএম মনিরুল ইসলাম: ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), ইডকল
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক ‘গ্রিন ডায়ালগ’-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]
