শৈশবের তিন বান্ধবীর আনন্দভ্রমণ পরিণত হলো আজীবনের কান্নায়। কিছুক্ষণ আগেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে প্রাণে বাঁচলেন দুই বান্ধবী, ভেতরে থেকে গেলেন নাসরিন। কক্সবাজারে সমুদ্র দেখতে এসেছিলেন তিন বান্ধবী। উদ্দেশ্য ছিল কয়েকটি আনন্দময় দিন এক সঙ্গে কাটানো, শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করা, আর ঘুরে বেড়িয়ে ফিরে যাওয়া আপন ঠিকানায়। গত বৃহস্পতিবার কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর তাদের পরিকল্পনা ছিল রোববার বাড়ি ফেরার। কিন্তু কে জানত, সেই ফেরা আর সবার এক সঙ্গে হবে না! সমুদ্রসৈকতের শহর থেকে দুজন ফিরবেন জীবনের নতুন এক দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে, আর একজন ফিরবেন নিথর দেহে। উখিয়ার ইনানীতে রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে প্রাণ হারিয়েছেন নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯)। তিনি ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি দেওয়ান ফয়সালের স্ত্রী এবং আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তিন বান্ধবীর সেই আনন্দভ্রমণে নাসরিনের সঙ্গে একই কক্ষে ছিলেন তার দুই শৈশবের সঙ্গী। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আগুন লাগার কিছুক্ষণ আগেই কক্ষ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন ওই দুই বান্ধবী। প্রাণে বেঁচে যান তারা। অথচ তখনো কক্ষের ভেতরে ছিলেন নাসরিন। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আগুনের ভয়াবহতায় তিনি আটকা পড়ে প্রাণ হারান। যে দুই বান্ধবীর সঙ্গে জীবনের কত স্মৃতি ভাগাভাগি করেছেন, যাদের সঙ্গে হাসি-আড্ডায় কাটিয়েছেন শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো, সেই প্রিয় মানুষ দুজনের চোখের সামনেই যেন থমকে গেল। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান একই কক্ষের দুই মানুষ ফিরে পেলেন জীবন, আরেকজন চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন।
কত কথা ছিল তাদের! হয়তো সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে আরও অনেক গল্প করার কথা ছিল। হয়তো এক সঙ্গে ছবি তোলা, স্মৃতি জমিয়ে রাখা আর রোববার বাড়ি ফিরে প্রিয়জনদের কাছে ভ্রমণের গল্প শোনানোর পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু সেই গল্পগুলো আর বলা হবে না নাসরিনের। তার জন্য অপেক্ষা করা আপনজনদের কাছে এখন আনন্দের কোনো খবর নয়, বরং নেমে এসেছে শোকের এক গভীর অন্ধকার।
একটি ভ্রমণ, তিনটি প্রাণের কাছাকাছি থাকা বন্ধুত্ব, আর কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানÑ সব কিছু বদলে দিল একটি আগুন। যে দুই বান্ধবী নিরাপদে বেরিয়ে এসেছেন, তাদের কাছে বাকি জীবন হয়তো বারবার ফিরে আসবে সেই মুহূর্তের স্মৃতি। কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পরও যে প্রিয় মানুষটি ভেতরে রয়ে গিয়েছিলেন, তার শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। নাসরিনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাক্সক্ষীদের মধ্যে। একজন স্ত্রী, পরিবারের প্রিয় মানুষ এবং শিক্ষিকা হিসেবে তিনি ছিলেন অনেকের জীবনের অংশ। তার এই আকস্মিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য স্মৃতি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও। একই কক্ষে পাশাপাশি থাকার পরও নিয়তি দুজনকে ফিরিয়ে দিল জীবনের পথে, আর নাসরিনকে নিয়ে গেল চিরবিদায়ের ওপারে। আনন্দভ্রমণের স্মৃতি তাই এখন দুই বান্ধবীর কাছে শুধু স্মৃতি নয়, এক প্রিয় মানুষকে হারানোর আজীবনের বেদনা।