আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া যাদের মূল কাজ—সেই পুলিশই যখন নিজেদের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখন প্রশ্ন ওঠে পুরো ব্যবস্থার ওপর। সম্প্রতি খুলনা নগরীতে ঘটে গেছে এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যা কেবল খুলনা নয়, গোটা দেশজুড়েই আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ৮ অক্টোবর খুলনায় ছিনতাইকারীদের হামলায় পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহ আলম গুরুতর আহত হওয়ার পর ঘটে এক নজিরবিহীন ঘটনা। খুলনা জেলা পুলিশ প্রশাসন খোদ পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশেই জারি করে এক সতর্কবার্তা- এখন থেকে রাতে আর একা চলাচল করা যাবে না। এবারে চলুন ঘটনার বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক।
খুলনায় ঠিক কী ঘটেছে?
গত ৮ অক্টোবর গভীর রাতে খুলনা নগরীর খানজাহান আলী রোডে খুলনা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহ আলম। অভিযান শেষে ফেরার পথে তার ওপর হামলা চালানো হয়, ছিনিয়ে নেওয়া হয় মোবাইল ও মানিব্যাগ। আহত ওই কর্মকর্তা বর্তমানে ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
পুলিশের বিশেষ নির্দেশনা ও নোটিশ
এ ঘটনার পরদিনই, অর্থাৎ গত ৯ অক্টোবর, খুলনা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) থেকে পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ ফারুকের স্বাক্ষর করা একটি আদেশ জারি করা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানা এলাকায় পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে গিয়ে পুলিশ সন্ত্রাসী হামলার শিকার হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য ডিউটিতে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ রাত্রিকালে একাকী চলাচল না করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।’
এ বিষয়ে ইউনিট ইনচার্জদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সতর্কতামূলক এ চিঠির অনুলিপি পুলিশের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ আছে।
তদন্তের অগ্রগতি ও আইনি পদক্ষেপ
এদিকে পুলিশ কর্মকর্তার ওপর এই হামলার ঘটনায় খুলনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক উপপরিদর্শক বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে খুলনা থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যেই অভিযান শুরু হয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সচেতন রয়েছে বলেও পুলিশের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং আহত পুলিশ কর্মকর্তা এখনো আশঙ্কামুক্ত নন বলে জানা গেছে।
পুলিশ অনিরাপদ হলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
পুলিশ প্রশাসনের এই অবস্থান কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের মনে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠছে—যাদের কাঁধে জনগণের সুরক্ষার ভার, তারাই যদি রাতে একা চলতে ভয় পান, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা সুনিশ্চিত?
খুলনার স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এভাবে কোনো নগরী চলতে পারে না। অপরাধীরা যখন বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর সাহস পায়, তখন পুরো শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই হুমকির মুখে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিশ্চয়ই জরুরি। কিন্তু একই সাথে প্রশ্ন থাকে—সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারীদের এই দাপট থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা ত্বরান্বিত হয়েছে? খুলনার এ ঘটনায় অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে খুলনা তথা সারা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক কোন দিকে যায়।
