সময়ের সঙ্গে এসব প্রতিযোগিতায় সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রতিযোগীদের ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, মেধা ও দক্ষতাও গুরুত্ব পেতে থাকে। বাংলাদেশের নারীদের আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ইতিহাসও কয়েক দশকের।
বিশ্বে সুন্দরী প্রতিযোগিতার ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৫১ সালে লন্ডনে মিস ওয়ার্ল্ডের প্রথম আসর অনুষ্ঠিত হয়। এটি বর্তমানে চলমান আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। পরের বছর শুরু হয় আরেক সুন্দরী প্রতিযোগিতা ‘মিস ইউনিভার্স’। এরপর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একে একে আরো বেশ কয়েকটি সুন্দরী প্রতিযোগিতা চালু হয়, যার বিস্তৃতি ছড়িয়ে পড়ে নানা দেশে। সময়ের সঙ্গে এসব প্রতিযোগিতায় সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রতিযোগীদের ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, মেধা ও দক্ষতাও গুরুত্ব পেতে থাকে। বাংলাদেশের নারীদের আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ইতিহাসও কয়েক দশকের। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কেউ জায়গা করে নিয়েছেন পরবর্তী ধাপে, কেউ অর্জন করেছেন স্বীকৃতি। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে। এ ধারাকে আরো এগিয়ে নিতে প্রয়োজন যথাযথ প্রস্তুতি, পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতা-পরবর্তী কাজের সুযোগ।
অংশগ্রহণ ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা
১৯৯৪ সালে প্রথম মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন অনিকা তাহের। এরপর ১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন বিলকিস সাথী, ১৯৯৬ সালে রেহনুমা দিলরুবা চিত্রা, ১৯৯৯ সালে তানিয়া রহমান টনি, ২০০০ সালে সোনিয়া গাজী ও ২০০১ সালে তাবাসসুম ফেরদৌস শাওন এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৭ সালে মিস ওয়ার্ল্ডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন জেসিয়া ইসলাম। তিনি প্রতিযোগিতার শীর্ষ ৪০-এ জায়গা করে নেন। পরের বছর জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী মিস ওয়ার্ল্ডে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়ে শীর্ষ ৩০-এ জায়গা করে নেন। ২০১৯ সালে রাফা নানজিবা তোরসা মিস ওয়ার্ল্ডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং পিপলস চয়েস ও মাল্টিমিডিয়া অ্যাওয়ার্ডের শীর্ষ ১০-এ জায়গা করেন।
একই বছর শিরিন আক্তার শীলা প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে মিস ইউনিভার্সে অংশ নেন। ২০২৩ সালে ফারজানা ইয়াসমিন অনন্যা জাপানে অনুষ্ঠিত মিস ইন্টারন্যাশনালে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। ২০২৫ সালে তানজিয়া জামান মিথিলা মিস ইউনিভার্সের শীর্ষ ৩০-এ জায়গা করে নেন। সর্বশেষ এ বছর সামানজার সাঈদ মিস ওয়ার্ল্ডের ‘বিউটি উইথ আ পারপাস’ বিভাগে বিশ্বের শীর্ষ ২৪-এ পৌঁছে।
একই বিভাগে এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের শীর্ষ ছয় প্রতিযোগীর মধ্যে ছিলেন তিনি। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়লেও অংশগ্রহণের সংখ্যা ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে বলে মনে করেন মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর আজরা মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আগে আমাদের অংশগ্রহণ কয়েকটি বড় প্রতিযোগিতায় সীমিত ছিল। এখন বছরে অন্তত ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব হচ্ছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এসব দেশে সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে ঘিরে বিভিন্ন পেশা ও ব্যবসার বিকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশেও এ ক্ষেত্রের বিকাশ ঘটাতে হলে অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট পেশাগুলোর উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।’
প্রস্তুতিতে ঘাটতি
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিযোগীদের প্রস্তুতির মান উন্নয়নও জরুরি। শুধু উপযুক্ত প্রতিযোগী নির্বাচন করলেই ভালো ফল পাওয়া যায় না। এজন্য প্রয়োজন পেজেন্টে হাঁটা, পোশাক নির্বাচন, সাজসজ্জা ও ব্যক্তিত্ব উপস্থাপনের প্রশিক্ষণ। দেশে এসব ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবীর ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন আজরা মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে পেজেন্ট ওয়াকের প্রশিক্ষক খুবই কম। মেকআপ, চুলের সাজ ও গ্রুমিংয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী গাউন তৈরির ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে ধাপে ধাপে উদ্যোগ নিলে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।’
প্রস্তুতির এ ঘাটতি কাটাতে বাহ্যিক উপস্থাপনার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রতিযোগীদের জ্ঞান, চিন্তাভাবনা ও যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে হলে শুধু সাজসজ্জা বা হাঁটাচলার কৌশল জানাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, সমসাময়িক বিষয়ে ধারণা এবং নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরার দক্ষতা। মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৯-এর বিচারক ও ওমেন্স ওয়ার্ল্ডের সিইও ফারনাজ আলমের মতে, গ্রুমিংয়ের ক্ষেত্রে এসব বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘কীভাবে হাঁটতে, কথা বলতে ও বসতে হবে, পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান, বই পড়া এবং নিজের বক্তব্য সুন্দরভাবে উপস্থাপনের দক্ষতাও জরুরি। দেশ-বিদেশের সমসাময়িক ঘটনা ও সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং নিজের কাজের লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণাও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ।’
সৌন্দর্যের বাইরেও যোগ্যতা
ফারনাজ আলমের মতো একই ধারণা পোষণ করেন ২০১৮ সালে মিস ওয়ার্ল্ডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশীও। তিনিও মনে করেন, আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতা শুধু সৌন্দর্য প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসব প্রতিযোগিতায় নিজের যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তা তুলে ধরার পাশাপাশি সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডে অবদান রাখারও সুযোগ থাকে।
তিনি বলেন, ‘সুন্দরী প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীদের গায়ের রঙ বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি একজন প্রতিযোগীর দক্ষতা ও প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে হলে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের জন্য ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও পরিশ্রমই গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রতিযোগিতার পর ক্যারিয়ারের পথ
প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিচিতি পাওয়ার পরও পেশাগত জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন কাজের সুযোগ ও যথাযথ দিকনির্দেশনা। কিন্তু প্রতিযোগিতা থেকে পরিচিতি পেলেও পরবর্তী সময়ে কাজ পাওয়া সবসময় সহজ হয় না। এমন অভিজ্ঞতার কথা জানান মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৯-এর বিজয়ী রাফা নানজিবা তোরসা। তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার পর পরিচিতি বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু কাজের সুযোগ পাওয়া সহজ হয়নি। পেশাগত জীবনের জন্য আয়োজকদের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা বা সহায়তা পাইনি। নিজের চেষ্টা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় এগিয়ে যেতে হয়েছে। প্রতিযোগিতা থেকে উঠে আসা কিংবা অন্যভাবে বিনোদনজগতে আসা—সব শিল্পীর জন্য কাজের সুযোগ ও যথাযথ দিকনির্দেশনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’
তবে প্রতিযোগিতার গুরুত্ব শুধু ব্যক্তিগত পরিচিতি বা ক্যারিয়ার গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের পরিচিতি বাড়ানো এবং নতুন যোগাযোগ তৈরিরও সুযোগ করে দিতে পারে। তোরসার মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশী প্রতিনিধি ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও তৈরি হতে পারে। এজন্য প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধ বুঝে দায়িত্বশীলভাবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের আয়োজন হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসা জরুরি।
সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র
আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে ঘিরে দেশে প্রশিক্ষণ, পোশাক নকশা, মেকআপ ও অন্যান্য পেশাগত দক্ষতা বিকাশের সুযোগ রয়েছে। প্রতিযোগীদের প্রস্তুতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতা-পরবর্তী পেশাগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ ক্ষেত্রের বিকাশ ত্বরান্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে এসব মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে দেশের সংস্কৃতি ও সামাজিক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার সুযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ, মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতা-পরবর্তী কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আরো কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
