আয় বাড়লেও প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল মুনাফার পূর্বাভাস ও বিজ্ঞাপন ব্যবসায় ধীরগতির কারণে চাপে পড়েছে জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিনেমা ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মতো মূল কনটেন্টের মান উন্নয়নে আরও বেশি মনোযোগ দিতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে কনটেন্ট তৈরির কৌশলেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন নেটফ্লিক্সের সহ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) টেড সারানডোস।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় নেটফ্লিক্সের আয় ১১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২৮৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রায় তিন বছরের মধ্যে এটিই প্রতিষ্ঠানটির আয়ের সবচেয়ে ধীর প্রবৃদ্ধি। এ ছাড়া চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে মুনাফার যে পূর্বাভাস দিয়েছে নেটফ্লিক্স, তা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে কম।
প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চতুর্থ প্রান্তিকে নিট মুনাফা হতে পারে ২৭৯ কোটি ডলার এবং শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়াতে পারে ৬৭ সেন্টে। অথচ বিশ্লেষকদের গড় পূর্বাভাস ছিল নিট মুনাফা ৩০৭ কোটি ডলার ও শেয়ারপ্রতি আয় ৭৩ সেন্ট। এই পূর্বাভাস প্রকাশের পর মঙ্গলবার লেনদেন-পরবর্তী সময়ে নেটফ্লিক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৬৪ দশমিক ৬৬ ডলারে নেমে আসে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের পূর্বাভাসও কমিয়েছে নেটফ্লিক্স। আগে এ খাত থেকে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার আয়ের প্রত্যাশা থাকলেও এখন তা কমিয়ে ২৭০ কোটি ডলার করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনসংশ্লিষ্ট কিছু সুবিধা চালুর কাজ প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতিতে এগোনোয় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহীরা।
মূল কনটেন্টে বাড়তি গুরুত্ব
দর্শক ধরে রাখা ও নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিডিও গেম, পডকাস্ট ও সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছে নেটফ্লিক্স। তবে ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ায় প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নেটফ্লিক্স কীভাবে নতুন দর্শক আকৃষ্ট করবে এবং বর্তমান গ্রাহকদের ধরে রাখবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকেরা।
বিনিয়োগ বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান পিপি ফোরসাইটের পাওলো পেসকাতোরের মতে, নেটফ্লিক্স এখনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে এমন কিছু ক্ষেত্রে মনোযোগ দিচ্ছে, যেগুলো দর্শকদের কাছে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয়। তাঁর মতে, দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করে এমন কনটেন্ট নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটির আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
নেটফ্লিক্সের সহ-সিইও টেড সারানডোসও কনটেন্টের মান উন্নয়নে জোর দিয়েছেন। আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক ভিডিও কলে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির আরও ভালো করার সুযোগ রয়েছে। কনটেন্টের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেও উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
সারানডোস বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাহী পর্যায়ের রদবদলও এই লক্ষ্য অর্জনের অংশ। সৃজনশীল ব্যক্তিরা যাতে নেটফ্লিক্সকে নিজেদের সেরা কাজ উপস্থাপনের উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি, তৃতীয় পক্ষের তৈরি কনটেন্ট লাইসেন্সের মাধ্যমে নিজেদের সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কর্মী ছাঁটাই ও নেতৃত্বে পরিবর্তন
কনটেন্ট কৌশলে নতুন করে মনোযোগ দেওয়ার উদ্যোগ এসেছে কর্মী ছাঁটাই ও শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর। গত সপ্তাহে নেটফ্লিক্স প্রায় এক হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মীর প্রায় ৬ শতাংশ। এর আগে কনটেন্ট বিভাগের প্রধান বেলা বাজরিয়াকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় ডিজনি ও ফক্সের সাবেক নির্বাহী পিটার রাইসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান ড্যান লিনও প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন নেটফ্লিক্সের কনটেন্ট পরিকল্পনায় নতুন দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সারানডোসের বক্তব্য, কৌশলে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিদ্যমান পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
এদিকে, চলতি বছরের শুরুতে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে অধিগ্রহণের প্রতিযোগিতায় হেরে যায় নেটফ্লিক্স। প্রতিষ্ঠানটির সমৃদ্ধ কনটেন্ট সংগ্রহ শেষ পর্যন্ত ডেভিড এলিসনের নেতৃত্বাধীন স্কাইড্যান্সের হাতে যায়। ভবিষ্যতে অন্য প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
নেটফ্লিক্সের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাহকসংখ্যা ও ব্যবসার পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত কিছু বাইরের তথ্য প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না। সারানডোসের মতে, এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং দর্শকদের জন্য আকর্ষণীয় কনটেন্ট তৈরি করাই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আয় বাড়লেও মুনাফার পূর্বাভাস ও বিজ্ঞাপন ব্যবসায় চাপ নেটফ্লিক্সকে নতুন করে নিজেদের অগ্রাধিকার পর্যালোচনায় বাধ্য করছে। কনটেন্টের মান বাড়ানো এবং দর্শকদের ধরে রাখার কৌশল কতটা সফল হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির বড় একটি অংশ।
