মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর জন্য সবসময় বিপুল সম্পদ কিংবা অসাধারণ কোনো কাজের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একটি কোমল বাক্যই হয়ে ওঠে ভালোবাসার সেতু, হতাশ হৃদয়ের সান্ত্বনা এবং ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক জোড়া লাগানোর মাধ্যম। তাই ইসলামে উত্তম ও সুন্দর কথাবার্তার গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর।
হজরত আদি ইবনে হাতিম (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো, যদিও অর্ধেক খেজুর দান করার মাধ্যমে হয়। আর যদি তা-ও না পাও, তবে একটি উত্তম কথা বলে।’ -সহিহ বোখারি: ৬৫৬৩
মানুষের জীবনে সুন্দর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আদর্শ হলেন নবী মুহাম্মদ (সা.)। তার জীবন ছিল সত্যবাদিতা, কোমলতা, ক্ষমাশীলতা, প্রজ্ঞা ও মার্জিত কথাবার্তার অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি মানুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতেন, যাতে তাদের সম্মান অক্ষুণ্ন থাকে এবং তারা সত্য গ্রহণের সুযোগ পায়। কাউকে সংশোধন করার প্রয়োজন হলেও তিনি যথাসম্ভব প্রজ্ঞা ও কোমলতার পথ অবলম্বন করতেন। আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় রাসুল (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে বলেন, ‘আর নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ -সূরা কলম: ৪
তাই মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে কঠোরতা নয়, বরং প্রজ্ঞা, দয়া ও সুন্দর ভাষা অধিক ফলপ্রসূ। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোমলতা যে বিষয়ে থাকে, তাকে সুন্দর করে; আর যে বিষয় থেকে কোমলতা তুলে নেওয়া হয়, তাকে ত্রুটিপূর্ণ করে।’ -সহিহ মুসলিম: ২৫৯৪
পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র কিংবা দাওয়াতের ময়দান- সর্বত্র কোমল আচরণ মানুষের হৃদয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কঠোর ভাষা দিয়ে সাময়িকভাবে কাউকে নীরব করা গেলেও তার হৃদয় জয় করা যায় না। অন্যদিকে, বিনয়ী ও সদয় আচরণ মানুষকে কাছে টানে এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করে। পবিত্র কোরআনে জান্নাতবাসীদের এমন এক গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা উত্তম কথার মর্যাদা ও পরকালীন গুরুত্ব তুলে ধরে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদেরকে পবিত্র বাক্যের দিকে পরিচালিত করা হয়েছিল এবং তাদেরকে পরিচালিত করা হয়েছিল পরম প্রশংসিত আল্লাহর পথে।’ -সূরা হাজ: ২৪
মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক অনেক সময় বড় কোনো কারণে নয়, বরং একটি অসতর্ক মন্তব্য, কঠোর বাক্য কিংবা ভুলভাবে প্রকাশ করা মতামতের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে রাগের মুহূর্তে মানুষ এমন কিছু বলে ফেলে, যা পরে ক্ষমা চাইলেও সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। তাই কথা বলার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম শব্দ বেছে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমার বান্দাদের বলো, তারা যেন এমন কথা বলে, যা উত্তম। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’ -সূরা ইসরা: ৫৩
মানুষের চরিত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখন, যখন সে রাগান্বিত হয়, অপমানিতবোধ করে কিংবা অন্যের আচরণে কষ্ট পায়। স্বাভাবিক অবস্থায় সুন্দর কথা বলা সহজ; কিন্তু উত্তেজনার মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অথচ এ সময়ই একজন মানুষের আত্মসংযম, ধৈর্য ও তাকওয়ার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ -সহিহ বোখারি: ৬১১৪
কেউ কটু কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের ভাষায় জবাব দেওয়া আবশ্যক নয়। বরং ধৈর্য ধারণ করা, উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং উপযুক্ত সময়ে সুন্দরভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরা অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে। মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, ‘আর রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের সম্বোধন করলে তারা বলে, ‘সালাম’।’ -সূরা ফুরকান: ৬৩
মানুষের আর্থিক অবস্থা, সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সামর্থ্য এক রকম নয়। কেউ স্বচ্ছল, কেউ অভাবগ্রস্ত; কেউ সুস্থ, কেউ বিপদে জর্জরিত। একজন মুমিনের উত্তম চরিত্রের পরিচয় হলো, তিনি মানুষের অবস্থান বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেন। বিশেষ করে দরিদ্র, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রতি সদয় হওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সদয় কথা ও ক্ষমা সেই দানের চেয়ে উত্তম, যার পরে কষ্ট দেওয়া হয়। আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, পরম সহনশীল।’ -সূরা বাকারা: ২৬৩
উত্তম কথা বলার অর্থ এই নয় যে, মানুষ সব সময় নীরব থাকবে কিংবা অন্যায় দেখেও প্রতিবাদ করবে না। বরং ইসলাম মানুষকে সত্য কথা বলতে, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখতে উৎসাহিত করে। তবে এসব করতে গিয়েও ভাষার শালীনতা, প্রজ্ঞা ও কল্যাণের উদ্দেশ্য বজায় রাখতে হবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে, অথবা নীরব থাকে।’ -সহিহ বোখারি: ৬০১৮
পবিত্র কোরআন ও হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ আমাদের শিক্ষা দেয়, মুমিনের কথাবার্তায় সততা, শালীনতা, কোমলতা ও কল্যাণের প্রতিফলন থাকা উচিত। তাহলেই সেই কথা হবে মুমিনের চারিত্রিক সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ।
