দুটি ঘড়ি একসঙ্গে বাজছে
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এতদিন ছিল প্রান্তিক প্রসঙ্গ; আজ তা মূল আলোচ্য। কারণ আমাদের সামনে দুটি ঘড়ি একসঙ্গে বাজছে। প্রথমটি এলডিসি উত্তরণের। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরোনোর কথা ছিল। সরকার তিন বছর, অর্থাৎ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছে; জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি ও ইকোসক তার পক্ষে মত দিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ পরিষদ। কিন্তু এই বাড়তি সময় অব্যাহতি নয়, প্রস্তুতির সুযোগ। শুল্কসুবিধা একদিন শেষ হবেই; তখন টিকে থাকার মুদ্রা হবে উৎপাদনশীলতা, আর তার আরেক নাম দক্ষতা।
দ্বিতীয়টি জনমিতির। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এখন আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ, কিন্তু এই জানালা চিরকাল খোলা থাকে না। তাই প্রশ্নটি “আমরা কত মানুষ” নয়, প্রশ্নটি “কতজন কাজের উপযোগী”।
আসন আছে, শিক্ষার্থী নেই
আমাদের কারিগরি শিক্ষার সমস্যা এখন আর অবকাঠামোর স্বল্পতা নয়; সমস্যা হলো তৈরি অবকাঠামোতে শিক্ষার্থী আসছে না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আসন ছিল ১৯ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি, ভর্তি হয়েছে প্রায় পৌনে ১০ লাখ। বেসরকারি পলিটেকনিকে আসন ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি, ভর্তি মাত্র ৩০ হাজার ৬১৪। ফলে চলতি বছর ২৪৬টি প্রতিষ্ঠানে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি বন্ধ করা
হয়েছে, আরও ১১২টি পেয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিশ। সবগুলোই বেসরকারি, টানা তিন বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। ২০২৬ সালের এসএসসি (ভোকেশনাল) পাসের হার নেমেছে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে; আগের বছর ছিল ৭৩ দশমিক ৬২। অথচ লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ভর্তির হার ৩০ শতাংশে নেওয়া। এই ব্যবধান প্রচারের নয়, আস্থার।
শ্রম আমরা রপ্তানি করি, দক্ষতা নয়
দক্ষতার ঘাটতির মূল্য সবচেয়ে নির্দয়ভাবে দেখা যায় প্রবাসী শ্রমবাজারে। ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ পেয়েছেন; বিএমইটির হিসাবে তাঁদের ৪৩ শতাংশের বেশি স্বল্পদক্ষ ও ৩৪ শতাংশের বেশি আধা-দক্ষ, অর্থাৎ প্রতি চারজনের তিনজনই দক্ষ শ্রমিক হিসেবে যাননি। কম দক্ষতার অর্থ কম মজুরি, কম দরকষাকষি ও বেশি ঝুঁকি।
ঝুঁকি কেন্দ্রীভবনেরও। ২০২৫ সালে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশগামী কর্মী নেমে এসেছে ৯ লাখ ৬৯ হাজারে, পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন। গন্তব্য দেশগুলো এখন দক্ষতা সনদ বাধ্যতামূলক করছে; যে দেশ আগে প্রস্তুত হবে, বাজার তারই।
কাঠামো আছে, সমন্বয় নেই
আমাদের নীতিকাঠামোর অভাব নেই; অভাব কাঠামোগুলোর মধ্যে সংযোগের। ২০১৯ সালে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) গঠিত হয়েছে, যার গভর্নিং বডির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী। আছে জাতীয় প্রযাগ্যতা কাঠামো, পূর্ব অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি (আরপিএল), জাতীয় দক্ষতা পোর্টাল, ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিল, এনএসডিএর কর্মপরিকল্পনা ২০২২-২০২৭ এবং ৮৭টি কর্মকাণ্ডের টিভেট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ২০২৫-২০৩০। কিন্তু এই যন্ত্রাংশগুলো এখনো একটি যন্ত্র হয়ে ওঠেনি। দক্ষতা উন্নয়নের কাজ ছড়িয়ে আছে বহু মন্ত্রণালয় ও সংস্থায়, প্রতিটির নিজস্ব প্রকল্প, কারিকুলাম ও সনদ। সমন্বয়ের দায়িত্ব এনএসডিএকে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে ক্ষমতা ও জনবল দেওয়া হয়নি। আইএলও-র হিসাবে আমাদের শ্রমশক্তির মাত্র ৫ শতাংশ কোনো প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তাই প্রশ্নটি নীতির নয়, বাস্তবায়নের জবাবদিহির।
পাঁচটি গিঁট
আমার মতে সমস্যাগুলো পাঁচটি গিঁটে বাঁধা, একসঙ্গে খুলতে হবে।
প্রশিক্ষক। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষকই পাঠ্যবই। পলিটেকনিক ও টেকনিক্যাল স্কুল-কলেজে শিক্ষকের ঘাটতি বছরের পর বছর জমে আছে; আগস্টে শিক্ষামন্ত্রী সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। শূন্যপদ পূরণের পাশাপাশি প্রশিক্ষকের নিয়মিত শিল্প-সংযুক্তিও দরকার।
যন্ত্রপাতি ও কারিকুলাম। অনেক জায়গায় শিক্ষার্থী এমন যন্ত্রে শেখে, যা শিল্পে বহুদিন আগে বাতিল হয়েছে। কারিকুলাম হালনাগাদের গতি শিল্পের পরিবর্তনের চেয়ে ধীর।
শিল্পের সঙ্গে দূরত্ব। অ্যাটাচমেন্ট ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ বহু ক্ষেত্রে কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা। শিল্পকে গ্রহীতা ভাবা হয়েছে, অংশীদার নয়।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। অভিভাবকদের চোখে কারিগরি শিক্ষা এখনো “যারা পারেনি তাদের পথ”। এটি ভাঙতে দরকার প্রমাণ: স্নাতকরা কত আয় করছেন, কোথায় পৌঁছেছেন, তার নিয়মিত তথ্য।
ঝরে পড়া ও অসমতা। এ বছর এইচএসসি পর্যায়ে কারিগরি বোর্ডের
নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ ফরম পূরণ করেননি; সাধারণ বোর্ডে এই হার ৩৩ দশমিক ০৪। ছাত্রীসংখ্যা অবশ্য ২৯ হাজার ৫০৮ থেকে বেড়ে ৩০ হাজার ৪১২ হয়েছে।
চাহিদা যেখানে, নেতৃত্বও সেখানে
রাষ্ট্র দক্ষতা উন্নয়নের অবকাঠামো, অর্থায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ দিতে পারে; কিন্তু কোন দক্ষতা কতটা দরকার, সে উত্তর আছে শিল্পের কাছে। তাই সফল টিভেট ব্যবস্থাগুলো শিল্পনেতৃত্বাধীন; জার্মানির দ্বৈত ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী কারখানা ও শ্রেণিকক্ষ দুটোতেই শেখে। মডেল আমদানি করা যায় না, নীতিটি সর্বজনীন: যে দক্ষতার ক্রেতা শিল্প, তার মানদণ্ডও নির্ধারণ করবে শিল্প।
আমাদের এখানে এই ভূমিকার কাঠামো আছে: ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিল। এগুলোকে প্রকল্পের আয়ু থেকে বের করে স্থায়ী অর্থায়ন ও সচিবালয় দিতে হবে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট সেক্টর স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনে আমরা ঠিক এই বিশ্বাস থেকেই কাজ করছি দক্ষতা উন্নয়ন যতক্ষণ সরকারি কর্মসূচি হিসেবে থাকবে, ততক্ষণ তা সরবরাহনির্ভর থাকবে; আর যেদিন তা শিল্পের নিজস্ব বিনিয়োগ হয়ে উঠবে, সেদিন থেকেই তা চাহিদানির্ভর হবে। নিয়োগদাতারা যখন দেখবেন প্রশিক্ষিত কর্মীর উৎপাদনশীলতা বেশি, অপচয় কম, দুর্ঘটনা কম - তখন প্রশিক্ষণ আর খরচ থাকবে না, বিনিয়োগ হবে।
আমার প্রস্তাব: সরকার দেবে অর্থায়ন, মানদণ্ড, সনদের বৈধতা ও তদারকি; শিল্প দেবে চাহিদার তথ্য, কারখানায় প্রশিক্ষণের জায়গা, প্রশিক্ষকের সংযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। অর্থায়নে খাতভিত্তিক স্কিলস লেভি বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে এক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে চাঁদা দেবে এবং সেই অর্থ ওই খাতেরই প্রশিক্ষণে ফিরবে।
যে দক্ষতার কথা আমরা এখনো বলছি না
আমাদের আলোচনায় এখনো প্রাধান্য পায় ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিক্যাল ও মোটর মেকানিক্স। এগুলোর প্রয়োজন ফুরোয়নি, কিন্তু এগুলোই ভবিষ্যৎ নয়।
অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রথমে প্রতিস্থাপন করবে পুনরাবৃত্তিমূলক, আধা-দক্ষ কাজ, যেখানে আমাদের কর্মীদের বড় অংশ আটকে আছে। আবার একই প্রযুক্তি নতুন পেশা তৈরি করছে: মেকাট্রনিকস, সিএনসি ও শিল্প-রোবোটিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, বৈদ্যুতিক যানের সার্ভিসিং, লজিস্টিকস, তথ্য-নিরাপত্তা। সরকার কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি চীনা, জাপানি, কোরিয়ান ও আরবির মতো তৃতীয় ভাষা যুক্ত করার পরিকল্পনা জানিয়েছে; সেটিকে পাইলট থেকে মূলধারায় নিতে হবে।
আজকের তরুণ কর্মজীবনে একাধিকবার দক্ষতা বদলাতে বাধ্য হবেন। তাই টিভেটকে “একবারের শিক্ষা” ভাবা চলবে না; দরকার প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মডিউলভিত্তিক, সন্ধ্যাকালীন ও অনলাইন পুনঃদক্ষতায়ন ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি মডিউলের সনদ জমে পূর্ণ যোগ্যতায় রূপ নেয়।
নাকি দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলব? সিদ্ধান্তটি সরকারের একার নয়, শিল্পের একার নয়; সিদ্ধান্তটি আমাদের সবার।
ছয়টি কাজ, যা এখনই শুরু করা যায়
নতুন আইন নয়, দরকার সিদ্ধান্ত। ছয়টি কাজ এখনই শুরু করা যায়।
১. সম্প্রসারণ নয়, সংহতকরণ: শ্রমবাজারের চাহিদা যাচাই না করে নতুন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নয়; শিক্ষার্থীশূন্য প্রতিষ্ঠান বাতিলের প্রক্রিয়া চলমান থাকুক।
২. প্রশিক্ষকই প্রথম বিনিয়োগ। শূন্যপদ পূরণের সঙ্গে প্রতি তিন বছরে
বাধ্যতামূলক শিল্প-সংযুক্তি এবং শিল্প থেকে খণ্ডকালীন প্রশিক্ষক নেওয়ার নমনীয় বিধান।
৩. ফলাফল দিয়ে অর্থায়ন। বরাদ্দ হোক স্নাতকের কর্মসংস্থান ও আয়ের ভিত্তিতে, যার জন্য দরকার নিয়মিত জাতীয় ট্রেসার স্টাডি।
৪. এক শিক্ষার্থী, এক সনদ-পরিচয়। বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ ও সনদকে জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর অধীনে এনে আরপিএলকে নিয়মিত সেবা করা।
৫. গন্তব্য দেশে স্বীকৃতি। পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি ও যৌথ মূল্যায়ন কেন্দ্রে কূটনৈতিক অগ্রাধিকার।
৬. তথ্যই ভিত্তি। শিল্প সমিতির অংশগ্রহণে খাতভিত্তিক দক্ষতা-চাহিদা পূর্বাভাস প্রকাশ এবং তার সঙ্গে আসন বণ্টন যুক্ত করা।
সময় আমাদের পক্ষে নেই
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়লে কিছু বাড়তি বছর পাব, কিন্তু জনমিতির ঘড়ি কোনো আবেদনে থামে না। আমাদের প্রতিষ্ঠান, আসন, আইন ও পরিকল্পনা আছে; যা নেই, তা হলো এগুলোকে একসূত্রে গাঁথার সদিচ্ছা ও জবাবদিহি। একটি তরুণ কারিগরি শিক্ষায় আসবেন তখনই, যখন দেখবেন এ পথে কাজ, মজুরি ও মর্যাদা মেলে। প্রশ্নটি তাই একটাই; আমরা কি পরবর্তী প্রজন্মকে সস্তা শ্রম হিসেবে রপ্তানি করব, নাকি দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলব? সিদ্ধান্তটি সরকারের একার নয়, শিল্পের একার নয়; সিদ্ধান্তটি আমাদের সবার।
লেখক : সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও সভাপতি, বাংলাদেশ প্রাইভেট সেক্টর স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (বিপিএসএসডি ফাউন্ডেশন)
