সংবাদ · সাধারণ
চলনবিলের অস্তিত্বের সংকট: প্রকৃতি বাঁচলেই বাঁচবে জীবিকা
২৩/১০/২০২৬

একটি জলাভূমি হারিয়ে গেলে শুধু পানির পরিমাণ কমে যায় না; হারিয়ে যায় মাছের আবাস, কৃষির সম্ভাবনা, মানুষের জীবিকা এবং একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিচয়। চলনবিল আজ সেই বাস্তবতার মুখোমুখি। দখল, দূষণ, পানিপ্রবাহের সংকট ও নির্বিচার সম্পদ আহরণে বিপর্যস্ত এ জলাভূমির ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।একসময় বর্ষায় দিগন্তজোড়া জলরাশি, দেশি মাছের প্রাচুর্য আর প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ছিল চলনবিল। বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদনের অর্থনীতি। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশিতে নৌকা চলত, আর শুষ্ক মৌসুমে বিলের পানি ও পলিকে কাজে লাগিয়ে চলত কৃষিকাজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই পরিচিত দৃশ্যপট। নদী-খাল ভরাট, জলাভূমি দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, পানির স্বল্পতা ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ চলনবিলের স্বাভাবিক পরিবেশকে চাপে ফেলেছে। এর মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি ও মানুষ—উভয়ই।আয়তনের হিসাব নয়, গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির ভবিষ্যৎচলনবিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি। সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বর্ষায় বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যায়; শুষ্ক মৌসুমে অনেক স্থান কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই মৌসুমি পরিবর্তনই চলনবিলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও নথিতে চলনবিলের আয়তন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে এর আয়তন ৫৫০ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত ‘বাংলার ভ্রমণ’ গ্রন্থে আয়তন বলা হয় ৪৪১ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ১৪২ বর্গকিলোমিটার। পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনেও আয়তন কমে আসার কথা উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন সময়ের পরিমাপপদ্ধতি এক না হওয়ায় এসব সংখ্যা সরাসরি তুলনা করে আয়তন হ্রাসের নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত জরিপ।আয়তনের হিসাব নিয়ে মতভেদ থাকলেও জলাভূমির ওপর চাপ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোথাও পলি জমে নদী-খালের গভীরতা কমেছে, কোথাও দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে পানিপ্রবাহ। কচুরিপানার বিস্তার এবং প্লাস্টিক, পলিথিনসহ নানা বর্জ্য পানিদূষণ বাড়াচ্ছে। কৃষিজমি সম্প্রসারণ ও অপরিকল্পিত সড়ক-অবকাঠামোও জলপ্রবাহে প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।জলাভূমি সংকুচিত হওয়ার অর্থ শুধু পানির বিস্তার কমে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাছের বিচরণক্ষেত্র ও প্রজনন, জলজ উদ্ভিদ, পাখি এবং মানুষের জীবিকা। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়ে। একই সঙ্গে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হতে পারে। তাই চলনবিলকে শুধু মৌসুমি জলরাশি হিসেবে দেখলে চলবে না। এর নদী, খাল, জলাশয় ও সংযোগপথকে একই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।মাছ কমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতিচলনবিলের সংকটের বড় দিক হলো মৎস্যসম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও কোথাও নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা আহরণের অভিযোগও রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা জলজ প্রাণীর আবাস সংকুচিত করতে পারে। নদী-খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, পানির গভীরতা কমে যাওয়া এবং দূষণও মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণে বাধা সৃষ্টি করে।মাছের উৎপাদন কমে গেলে ক্ষতি শুধু জেলেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাছ ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, শুঁটকি উৎপাদক এবং মৌসুমি শ্রমিকেরাও এর প্রভাবের মুখে পড়েন। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষের আয় কমে গেলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।এ কারণে মাছ রক্ষায় শুধু অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, নদী-খালের পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং মৎস্যসম্পদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাছ আহরণে বিধিনিষেধের সময় জেলেদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা না করে কেবল নিষেধাজ্ঞা দিলে তা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।শামুক-ঝিনুক আহরণে জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্যচলনবিলে শামুক-ঝিনুক আহরণ দরিদ্র মানুষের মৌসুমি আয়ের অন্যতম উৎস। সংগৃহীত শামুক-ঝিনুকের মাংস মাছের খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন এলাকার ঘেরে সরবরাহ করা হয়। খোলস থেকে তৈরি হয় খাওয়ার চুন। এভাবে আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতির একটি ক্ষুদ্র জীবিকাচক্র।স্থানীয়দের দাবি, তাড়াশের ২০ থেকে ২৫টি জলাভূমিতে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক নৌকায় শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। স্থান ও সময়ভেদে প্রতি বস্তা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়; পাইকারি পর্যায়ে দাম ওঠে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। স্থানীয় সংগ্রহকারীদের হিসাবে, এ কাজে একজন মানুষ দিনে কয়েক শ টাকা আয় করতে পারেন। ফলে অনেক দরিদ্র পরিবারের কাছে শামুক-ঝিনুক আহরণ শুধু মৌসুমি পেশা নয়, সংসার চালানোরও একটি অবলম্বন।কিন্তু এই জীবিকার আড়ালে রয়েছে পরিবেশগত উদ্বেগ। শামুক-ঝিনুক জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। নির্বিচারে আহরণে এদের প্রাকৃতিক মজুত কমে গেলে জলজ প্রাণীর খাদ্যপ্রাপ্তি ও পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আহরণের প্রকৃত মাত্রা এবং জলজ পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া সমস্যার ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা কঠিন।তাই শামুক-ঝিনুক আহরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দরিদ্র মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত করা যেমন সমাধান নয়, তেমনি পরিবেশগত প্রভাব উপেক্ষা করে নির্বিচারে আহরণের সুযোগ দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক জরিপের ভিত্তিতে আহরণের সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ, নিয়মিত নজরদারি এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন। পাশাপাশি এ পেশার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রকৃতি রক্ষা ও মানুষের জীবিকা—দুটিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে টেকসই সমাধান।শুঁটকি শিল্পে উৎপাদন কমছে, চাপে হাজারো মানুষের জীবিকাচলনবিলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে শুঁটকি উৎপাদন ও বাণিজ্য। বিলের মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার এ শিল্পে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু কাঁচা মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্পটি এখন সংকটে।মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উল্লাপাড়া ও তাড়াশের ৬০টি শুঁটকি বাজারে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৩০২ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৮৫ দশমিক ১৭ মেট্রিক টনে। এক বছরে উৎপাদন কমেছে ১১৬ দশমিক ৮৩ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম।তাড়াশের মহিষলুটিতে একসময় প্রায় ২৫টি শুঁটকি চাতাল চালু ছিল। এখন সেগুলোর প্রায় অর্ধেক বন্ধ হয়ে গেছে; সচল রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এ শিল্পে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই হাজারের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ মৌসুমি আয়ের ওপর নির্ভরশীল। একজন শ্রমিকের দৈনিক আয় প্রায় ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।চলনবিলের শুঁটকি দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর বাজার রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও দুবাইয়ের বাজারেও এ পণ্য যায়।মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর অঞ্চলে ২৭৫টি শুঁটকি চাতাল রয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৫০ মেট্রিক টন এবং সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন কাঁচা মাছ প্রয়োজন।উৎপাদন কমে যাওয়ার এই চিত্র দেখিয়ে দেয়, প্রাকৃতিক সম্পদের সংকট কীভাবে একটি শিল্পকে দুর্বল করে দিতে পারে। কাঁচা মাছের জোগান কমলে চাতাল বন্ধ হয়, শ্রমিক কাজ হারান, ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন এবং পরিবারগুলোর আয় কমে যায়। ফলে শুঁটকি শিল্পকে বাঁচাতে শুধু উৎপাদনস্থলের উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; যে জলাভূমি থেকে মাছ আসে, সেটিকেও রক্ষা করতে হবে।শুঁটকি শিল্পের আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাছ শুকানোর ব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার, বাজারজাতকরণে সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া প্রয়োজন। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক উৎস রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে শিল্পটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব হবে না।পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে প্রকৃতি রক্ষা করেবর্ষায় চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌভ্রমণ ও গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। পরিকল্পিত প্রচার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা গেলে চলনবিলকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।সরকারি উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। নিরাপদ নৌভ্রমণ, পরিচ্ছন্ন ঘাট, বিশ্রামাগার, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পণ্য বিক্রির বাজার গড়ে উঠলে নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যজীবী ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আয়ও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।তবে পর্যটনের নামে জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ কিংবা বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণের সুযোগ দেওয়া যাবে না। পর্যটনকেন্দ্র গড়তে হবে জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে। নৌযানের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে পর্যটন গড়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সেই পর্যটনের আকর্ষণকেই নষ্ট করবে।চলনবিল রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজনচলনবিলের সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। জলাভূমি ভরাট ও পানিপ্রবাহে বাধা মাছের আবাস ও প্রজননকে প্রভাবিত করে। মাছের উৎপাদন কমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুঁটকি শিল্প ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা। অন্যদিকে, শামুক-ঝিনুকের নির্বিচার আহরণ জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এসব সমস্যা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিরাজগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক দীপক কুমার করের মতে, চলনবিলের মাছের মজুত, উৎপাদন, শুঁটকি শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রকৃত অবস্থা জানতে সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন। মা মাছ ও পোনা রক্ষা, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, নদী-খালের পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং দখল উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি শুঁটকি শিল্পের উন্নয়ন, সহজ শর্তে ঋণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও জরুরি।চলনবিল রক্ষায় প্রথমেই প্রয়োজন জলাভূমির সীমানা ও বর্তমান অবস্থা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য জরিপ। এরপর দখল ও দূষণ বন্ধ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; নিয়মিত তদারকি ও ফলাফল মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে জলজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখতে হবে। জেলে, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহকারী ও শুঁটকি শ্রমিকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি না করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল করা কঠিন। স্থানীয় মানুষকে সমস্যার অংশ হিসেবে নয়, সমাধানের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।চলনবিলকে ঘিরে কৃষি, মৎস্য, শুঁটকি শিল্প ও পর্যটনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলে আগে এর প্রাকৃতিক ভিত্তি রক্ষা করতে হবে। উন্নয়ন মানে জলাভূমি ভরাট কিংবা নির্বিচারে সম্পদ আহরণ নয়; উন্নয়ন হলো প্রকৃতিকে টিকিয়ে রেখে মানুষের জীবনমান উন্নত করা।চলনবিলের সংকট তাই এখনই গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। দখল-দূষণ বন্ধ, নদী-খালের প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, মা মাছ ও পোনা রক্ষা, শামুক-ঝিনুক আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং শুঁটকি শিল্পের আধুনিকায়নে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। চলনবিল বাঁচানো মানে শুধু একটি জলাভূমি রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ।[লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗